
নিউজ ডেস্ক; যানজট কমাতে একের পর এক পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পুলিশ-প্রশাসনের তরফে রাস্তা পরিদর্শনও চলছে নিয়মিত। কিন্তু বাস্তবে শিলিগুড়ির যানজটের ছবিতে খুব একটা বদল আসছে না। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার বেহাল দশা, বাড়তে থাকা যানবাহনের চাপ এবং অপরিকল্পিত ভাবে ছোট রাস্তা থেকে মূল সড়কে গাড়ি ঢুকে পড়ার জেরে প্রতিদিনই দুর্ভোগে পড়ছেন শহরবাসী। কোথাও রাস্তার বড় বড় খানাখন্দ, কোথাও ভাঙা অংশ, আবার কোথাও সরু রাস্তার উপরেই অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ—সব মিলিয়ে শহরের স্বাভাবিক গতি যেন ক্রমশ কমে আসছে।
শিলিগুড়িতে গত কয়েক বছরে জনসংখ্যা এবং যানবাহনের সংখ্যা দুটোই বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে শহরের রাস্তার পরিকাঠামো কতটা বদলেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নতুন নতুন বসতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যানবাহনের চাপ বাড়লেও রাস্তার দৈর্ঘ্য তেমন বাড়েনি। ফলে পুরনো রাস্তার উপরেই প্রতিদিন বাড়ছে চাপ। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বর্ষার ধাক্কা। বৃষ্টির জলে বিভিন্ন জায়গায় রাস্তার পিচ উঠে গিয়ে তৈরি হয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত। কোথাও সেই গর্ত এতটাই গভীর যে গাড়ির গতি কমিয়ে পার হতে হচ্ছে। তার প্রভাব পড়ছে গোটা যান চলাচলের উপর।
শহরের এই পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষও। সামাজিক মাধ্যমে একাধিক বাসিন্দা রাস্তার বেহাল দশার ছবি ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন। শহরের বাসিন্দা দিলীপ দত্ত যেমন প্রশ্ন তুলেছেন, ‘‘বলুন, কোথায় ভালো রাস্তা আছে?’’ তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, শহরের একাধিক এলাকায় রাস্তার পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জমেছে।
বাবুপাড়ার বাসিন্দা অভিজিৎ চন্দের অভিযোগ, শুধু বড় রাস্তা নয়, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও পাড়ার রাস্তাও দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অপেক্ষায় রয়েছে। টিকিয়াপাড়া মোড়, জ্যোৎস্নাময়ী স্কুলের সামনের রাস্তা, তরাই তারাপদ হাইস্কুলের সামনে প্রধান সড়ক একাধিক জায়গায় রাস্তার অবস্থা খারাপ বলে তাঁর দাবি। এমনকি প্রাক্তন মেয়র অশোক ভট্টাচার্যের বাড়ির সামনের রাস্তার অবস্থাও দীর্ঘদিন ধরে বেহাল বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
এর ফলে শুধু গাড়ি চালকদের নয়, সাধারণ যাত্রী এবং পথচারীদেরও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। খানাখন্দ এড়িয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে অনেক সময় গতি কমাতে হচ্ছে। কোথাও আবার হঠাৎ ব্রেক কষতে হচ্ছে। তাতে পিছনে থাকা গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। পথচারীদের ক্ষেত্রেও রাস্তার ভাঙা অংশ পারাপার করা কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বৃষ্টির পরে গর্তে জল জমে গেলে কোন জায়গায় রাস্তা কতটা ভাঙা, তা বোঝা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
কলেজপাড়ার রাস্তাও একই সমস্যায় জর্জরিত বলে অভিযোগ। শিলিগুড়ি কলেজের এক নম্বর গেট থেকে পুলিশের ডিসিপি (ইস্ট) অফিস পর্যন্ত রাস্তার অবস্থা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। এই রাস্তা শহরের গুরুত্বপূর্ণ অংশের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। ফলে সেখানে যানবাহনের গতি কমলে তার প্রভাব আশপাশের এলাকাতেও পড়ে।
ভক্তিনগরের বাসিন্দা শিউলি সিনহার অভিজ্ঞতাও একই রকম। এনজেপি থেকে টিকিয়াপাড়া পর্যন্ত রাস্তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি জানিয়েছেন, প্রতিদিন টোটোয় করে বিধান মার্কেটে কাজে যেতে হয়। রাস্তার খারাপ অবস্থার কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে। তাঁর অভিযোগ, যে পথ স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দ্রুত পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব, সেটিই এখন যানজট এবং রাস্তার সমস্যার কারণে দীর্ঘ যাত্রায় পরিণত হচ্ছে।
রাস্তার বেহাল দশার প্রভাব পড়ছে পেশার ক্ষেত্রেও। ডেলিভারি কর্মীদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য পৌঁছে দিতে হয়। কিন্তু শহরের বিভিন্ন পাড়ার ভাঙাচোরা রাস্তা সেই কাজ কঠিন করে তুলছে বলে অভিযোগ। সুভাষপল্লির ডেলিভারি কর্মী সন্তোষ হালদারের বক্তব্য, রাস্তার কারণে যানবাহনের গতি কমে যায়। ফলে সময়মতো পণ্য পৌঁছে দেওয়া অনেক সময় সম্ভব হয় না।
শুধু রাস্তার গর্তই নয়, যানজটের আর একটি বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে ছোট রাস্তা ও গলি থেকে একসঙ্গে বহু যানবাহনের মূল সড়কে উঠে আসা। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে বিভিন্ন পাড়ার রাস্তা থেকে টোটো, অটো, ছোট গাড়ি এবং অন্যান্য যান মূল রাস্তায় ঢুকে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। শান্তিনগর-বৌবাজার, সুভাষপল্লি, হাকিমপাড়া এবং প্রধাননগরের মতো এলাকাতেও একই ছবি দেখা যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
শহরের যানজটের সমস্যা খতিয়ে দেখতে পুলিশও সক্রিয় হয়েছে। পুলিশ কমিশনার সৈয়দ ওয়াকার রাজা গত এক সপ্তাহে একাধিক বার শহরের বিভিন্ন রাস্তা পরিদর্শন করেছেন। পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, যানজট কমানোর জন্য নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। ট্র্যাফিক বিভাগের ডিসিপি কাজি শামসুদ্দিন আহমেদও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে একাধিক পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
অন্য দিকে, রাস্তা সংস্কারের আশ্বাসও মিলেছে প্রশাসনের তরফে। শিলিগুড়ির বিধায়ক তথা মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ জানিয়েছেন, খুব শীঘ্রই শহরের রাস্তা সংস্কারের কাজ শুরু হবে। শিলিগুড়ি পুরসভার এক আধিকারিকের বক্তব্য অনুযায়ী, রাস্তা সংস্কারের জন্য রাজ্যের পক্ষ থেকে পুরসভাকে ইতিমধ্যেই পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের রাস্তা মেরামতির জন্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা দেওয়ার কথাও জানা গিয়েছে।
তবে এখানেই রয়েছে বড় প্রশ্ন। বর্ষার মরশুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত বড় আকারে রাস্তা সংস্কারের কাজ করা সম্ভব নয় বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। ফলে আপাতত খানাখন্দ এড়িয়ে সাবধানে এবং ধীর গতিতে শহরের রাস্তায় চলাই শিলিগুড়িবাসীর ভরসা।
সামনেই পুজো। উৎসবের মরশুমে শিলিগুড়ির রাস্তায় যানবাহনের চাপ আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাইরে থেকে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের আগমনও বাড়বে। ফলে তার আগে রাস্তার পরিস্থিতি কতটা বদলায়, যানজট নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হয় এবং প্রতিশ্রুত সংস্কারের কাজ কতটা এগোয়—সেদিকেই এখন নজর শহরবাসীর। প্রশ্ন একটাই, পুজোর আগে কি সত্যিই খানাখন্দ পেরিয়ে ফের গতি পাবে শিলিগুড়ি?
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments