
নিউজ ডেস্ক; সুপ্রিম কোর্টে আগাম জামিনের আবেদন খারিজ হওয়ার পরেই তৎপরতা বাড়ল পশ্চিমবঙ্গের শালবনি জমি দুর্নীতি মামলায়। বৃহস্পতিবার আদালতের রায় সামনে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই কলকাতায় অভিযানে নামে রাজ্য পুলিশের CID এবং STF। শেষ পর্যন্ত কালীঘাটের ১২১ নম্বর বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হল সুমিত রায়কে। তদন্তকারীদের দাবি, সরকারি জমি বেআইনি ভাবে মিউটেশন এবং বিক্রির অভিযোগে চলা মামলায় সুমিতের ভূমিকা রয়েছে। তিনি তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ক হিসেবে পরিচিত।
সুমিতের গ্রেপ্তারিকে ঘিরে বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকেই সরগরম হয়ে ওঠে কালীঘাট এলাকা। সুপ্রিম কোর্টে তাঁর রক্ষাকবচ বা আগাম জামিনের আবেদন খারিজ হওয়ার পরেই দ্রুত পদক্ষেপ শুরু করে তদন্তকারী সংস্থাগুলি। জানা যায়, ১২১, কালীঘাট রোডের বাড়িতে সুমিত রয়েছেন। সেই খবর পাওয়ার পরেই সেখানে পৌঁছে যায় CID ও STF-এর একটি দল। নিরাপত্তার কারণে তদন্তকারীদের সঙ্গে ছিলেন ভিডিয়োগ্রাফারও। অভিযানের গোটা প্রক্রিয়া ভিডিয়োয় রেকর্ড করা হয় বলে জানা গিয়েছে।
কালীঘাটের ওই বাড়িটিকে ঘিরেই তৈরি হয় উত্তেজনা। তদন্তকারী দল সেখানে পৌঁছনোর সময় বাড়ির মূল গেটে তালা দেওয়া ছিল বলে সূত্রের খবর। এরপর আধিকারিকেরা গেট খোলার জন্য নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে কথা বলেন। অভিযোগ, সেই সময় দু’পক্ষের মধ্যে কিছুটা ধাক্কাধাক্কিও হয়। শেষ পর্যন্ত ভিতরে প্রবেশ করেন তদন্তকারীরা। বাড়ির ভিতরে গিয়ে সুমিত রায়ের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলেন তাঁরা। এরপর তাঁকে হেফাজতে নেওয়া হয়।
গ্রেপ্তারের পর সুমিত রায়কে নিয়ে যাওয়া হয় ভবানীভবনে। সেখানে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে তদন্তকারী সূত্রে জানা গিয়েছে। শালবনি জমি সংক্রান্ত মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, জমির নথি, মিউটেশন প্রক্রিয়া এবং জমি হস্তান্তরের সঙ্গে তাঁর কোনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগ ছিল কি না—সেই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
এ দিন বিধানসভায় অধিবেশন চলাকালীন সুমিতের গ্রেপ্তারের খবর পৌঁছয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অধিবেশন কক্ষেই বিষয়টি জানান বলে জানা গিয়েছে। তাঁর বক্তব্যের পর বিধানসভায় বিজেপি বিধায়কদের একাংশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। ফলে সুমিতের গ্রেপ্তারি শুধু তদন্তের পরিসরেই আটকে থাকেনি, তাৎক্ষণিক ভাবে রাজনৈতিক বিতর্কেরও কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
তবে এই মামলার মূল গুরুত্ব রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ এবং তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগে। আদালতে কেন্দ্রের হয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা সুমিতের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, শালবনিতে সরকারি জমি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে মিউটেশন করিয়ে পরে বেআইনি ভাবে বিক্রির ঘটনায় সুমিতের ভূমিকা রয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। জমি সংক্রান্ত লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত কয়েক জন দালালও তদন্তকারীদের কাছে সুমিতের নাম করেছেন বলে আদালতে দাবি করা হয়।
অন্য দিকে, সুমিতের হয়ে সওয়াল করা আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণ এই অভিযোগের বিরোধিতা করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, সুমিতের ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ওই ধরনের বেআইনি আর্থিক লেনদেন হয়েছে—এমন কোনও নির্দিষ্ট প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি। অর্থাৎ, তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ এবং অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে।
দু’পক্ষের বক্তব্য শোনার পর সুপ্রিম কোর্ট সুমিতের আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করে দেয়। আদালতের এই সিদ্ধান্তের পরেই রাজ্য তদন্তকারী সংস্থার তরফে তাঁকে গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া শুরু হয়। আইনি সুরক্ষা না থাকায় তদন্তকারীদের পরবর্তী পদক্ষেপের পথও কার্যত পরিষ্কার হয়ে যায়।
শালবনি জমি-কাণ্ডে সরকারি জমির মালিকানা, মিউটেশন এবং জমি বিক্রির প্রক্রিয়া নিয়ে তদন্ত চলছে। সরকারি জমি কী ভাবে ব্যক্তিগত মালিকানায় গেল, কারা সেই জমির মিউটেশন করিয়েছিল, জমির দালালদের ভূমিকা কী ছিল এবং পুরো প্রক্রিয়ায় কোনও প্রভাবশালী মহলের যোগ রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা।
সুমিত রায়ের গ্রেপ্তারির পর তদন্ত আরও কোন দিকে গড়ায়, সেটিই এখন দেখার। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তকারীরা আরও কোনও নাম বা তথ্য পান কি না, সেই দিকেও নজর রয়েছে। একই সঙ্গে জমি সংক্রান্ত নথি, আর্থিক লেনদেন এবং মিউটেশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরও তদন্তের আওতায় আনা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ঘটনাটির রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সুমিতের পেশাগত যোগাযোগের কারণে গ্রেপ্তারির ঘটনাটি ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে চর্চার বিষয় হয়েছে। বিরোধীরা ঘটনাটিকে সামনে রেখে শাসকদলের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। অন্য দিকে, মামলার আইনি প্রক্রিয়া এখনও চলমান এবং আদালতে ওঠা অভিযোগের সত্যতা শেষ পর্যন্ত তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে।
সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবারের ঘটনাপ্রবাহে একদিকে সুপ্রিম কোর্টের আগাম জামিন খারিজ, অন্য দিকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কালীঘাটের বাড়িতে CID-STF-এর অভিযান এবং সুমিত রায়ের গ্রেপ্তারি—পরপর এই ঘটনাগুলিই শালবনি জমি মামলাকে ফের রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এখন ভবানীভবনে জিজ্ঞাসাবাদের পর তদন্ত কোন নতুন মোড় নেয়, সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments