
নিউজ ডেস্ক; দীর্ঘ দিন ধরে কঠিন অসুখের সঙ্গে লড়াই করছিলেন মেদিনীপুরের ৩২ বছরের বাসিন্দা ব্রজগোপাল কামিল্যা। শরীর ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছিল। রক্তের সমস্যা এতটাই গুরুতর হয়ে উঠেছিল যে, নিয়মিত রক্ত দেওয়া এবং ওষুধে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, সুস্থ জীবনে ফেরার জন্য প্রয়োজন অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন বা বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট। কিন্তু চিকিৎসার সেই গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়েই তৈরি হয় বড় বাধা। পাওয়া যায়নি সম্পূর্ণ মিলযুক্ত বা ‘ফুল ম্যাচ’ ডোনার।
শেষ পর্যন্ত রোগীর সামনে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয় এক কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসাপদ্ধতিকে ঘিরে। পরিবারের এক সদস্যের সঙ্গে আংশিক মিলকে ভিত্তি করে করতে হয় ‘হ্যাপলো-আইডেন্টিক্যাল’ বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট। সেই জটিল চিকিৎসাতেই সাফল্য পেল কলকাতার এনআরএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। চিকিৎসকদের দাবি, সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ার চিকিৎসায় এই ধরনের সফল হ্যাপলো-আইডেন্টিক্যাল ট্রান্সপ্লান্ট সম্ভবত দেশে প্রথম।
চিকিৎসা সূত্রে জানা গিয়েছে, ব্রজগোপাল ‘সিভিয়ার অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া’তে আক্রান্ত ছিলেন। এই রোগে অস্থিমজ্জা পর্যাপ্ত পরিমাণে রক্তকণিকা তৈরি করতে পারে না। ফলে শরীরে লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা এবং প্লেটলেট—তিন ধরনের রক্তকণিকারই ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তার জেরে রোগীকে বারবার রক্ত নিতে হয়। একই সঙ্গে সংক্রমণের আশঙ্কা এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। গুরুতর অবস্থায় অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনই হয়ে ওঠে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা-পথ।
এনআরএসে প্রথম দিকে ব্রজগোপালের চিকিৎসা চলছিল ইমিউনোসাপ্রেসিভ থেরাপি এবং নিয়মিত রক্ত দেওয়ার মাধ্যমে। এই চিকিৎসার লক্ষ্য ছিল শরীরের অস্বাভাবিক প্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে অস্থিমজ্জা ফের রক্তকণিকা তৈরি করতে পারে। কিন্তু প্রত্যাশিত উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসকেরা অ্যালোজেনিক বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টের সিদ্ধান্ত নেন। অর্থাৎ, অন্য একজন দাতার অস্থিমজ্জা বা রক্তগঠনকারী স্টেম সেল রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করার পরিকল্পনা হয়।
সেখানেই সামনে আসে ডোনার সংক্রান্ত সমস্যা। অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে রোগী ও দাতার এইচএলএ বা ‘হিউম্যান লিউকোসাইট অ্যান্টিজেন’-এর মিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এইচএলএ শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা বাইরের কোষকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। সম্পূর্ণ মিল না থাকলে প্রতিস্থাপিত কোষকে রোগীর শরীর প্রত্যাখ্যান করতে পারে। আবার দাতার প্রতিরোধী কোষ রোগীর শরীরের অঙ্গ ও টিস্যুকে আক্রমণ করতে পারে। এই জটিলতাকে বলা হয় ‘গ্রাফ্ট ভার্সাস হোস্ট ডিজিজ’ বা জিভিএইচডি। গুরুতর ক্ষেত্রে এই সমস্যা প্রাণঘাতীও হতে পারে।
ব্রজগোপালের ক্ষেত্রে আদর্শ ‘ফুল ম্যাচ’ ডোনার পাওয়া যায়নি। তাঁর ৪৪ বছরের ভাইয়ের সঙ্গে এইচএলএ মিল ছিল মাত্র ৫/১০। অর্থাৎ, সম্পূর্ণ মিলের বদলে অর্ধেক মিলকে ভিত্তি করেই চিকিৎসার পথে এগোতে হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই ধরনের প্রতিস্থাপনকে বলা হয় ‘হ্যাপলো-আইডেন্টিক্যাল ট্রান্সপ্লান্ট’। সাধারণত পরিবারের বাবা-মা, ভাই-বোন বা সন্তানের মধ্যে এমন আংশিক মিল পাওয়া যেতে পারে। তবে এই পদ্ধতিতে সংক্রমণ, কোষ প্রত্যাখ্যান এবং জিভিএইচডি-র মতো জটিলতার আশঙ্কা তুলনামূলক ভাবে বেশি থাকে।
এই পরিস্থিতিতে এনআরএসের চিকিৎসকদের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল রোগীর শরীর এবং দাতার কোষের মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা। এক দিকে এমন ভাবে প্রস্তুতি নিতে হয়েছে, যাতে রোগীর শরীর নতুন কোষকে গ্রহণ করে। অন্য দিকে দাতার প্রতিরোধী কোষ যাতে রোগীর শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিরুদ্ধে আক্রমণ না চালায়, সে দিকেও নজর রাখতে হয়েছে। প্রতিস্থাপনের আগে ও পরে একাধিক ধাপে রোগীর শারীরিক অবস্থা, রক্তের উপাদান এবং সংক্রমণের সম্ভাবনা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
চিকিৎসকদের মতে, হ্যাপলো-আইডেন্টিক্যাল ট্রান্সপ্লান্টের ক্ষেত্রে শুধু অস্ত্রোপচার বা স্টেম সেল প্রতিস্থাপন করলেই কাজ শেষ হয় না। আসল লড়াই শুরু হয় তার পর। রোগীর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ, সংক্রমণ প্রতিরোধ, রক্তের মাত্রা ঠিক রাখা এবং প্রতিস্থাপিত কোষ শরীরে কাজ করছে কি না—প্রতিটি বিষয় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নজরে রাখতে হয়। ব্রজগোপালের ক্ষেত্রেও সেই দীর্ঘ ও জটিল পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে।
এনআরএসের এই সাফল্য চিকিৎসা মহলে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, দেশের বহু অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া আক্রান্ত রোগী বোনম্যারো প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হলেও সম্পূর্ণ মিলযুক্ত ডোনার না পাওয়ায় পিছিয়ে যেতে বাধ্য হন। অনেকের ক্ষেত্রেই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আংশিক মিল থাকলেও ঝুঁকির কারণে চিকিৎসা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। সেই জায়গায় সরকারি হাসপাতালে হ্যাপলো-আইডেন্টিক্যাল ট্রান্সপ্লান্টের সাফল্য নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দিতে পারে।
তবে চিকিৎসকেরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, এই পদ্ধতি সব রোগীর ক্ষেত্রে একই ভাবে প্রয়োগ করা যায় না। রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, সংক্রমণের ইতিহাস, অস্থিমজ্জার পরিস্থিতি, দাতার উপযুক্ততা এবং হাসপাতালের পরিকাঠামো—সব কিছু বিচার করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একই সঙ্গে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদল, উন্নত ল্যাবরেটরি ব্যবস্থা এবং প্রতিস্থাপনের পর দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
ব্রজগোপালের চিকিৎসার সাফল্য তাই শুধু একজন রোগীর সুস্থতার খবর নয়। সম্পূর্ণ মিলযুক্ত ডোনার না পাওয়া রোগীদের জন্য এটি আশার বার্তা। সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থায় জটিল বোনম্যারো প্রতিস্থাপনের সুযোগ আরও বাড়ানো গেলে বহু গুরুতর রক্তরোগে আক্রান্ত রোগী নতুন করে বাঁচার সুযোগ পেতে পারেন। এনআরএসের এই সাফল্য সেই সম্ভাবনাকেই আরও দৃঢ় করল।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments