Homeপুরুলিয়ামানবাজার-১প্রায় ২০ লক্ষ টাকা তছরুপের অভিযোগে গ্রেপ্তার প্রাক্তন প্রধান শিক্ষকের পুনর্বহাল! পুরুলিয়ার স্কুলে বিক্ষোভ

প্রায় ২০ লক্ষ টাকা তছরুপের অভিযোগে গ্রেপ্তার প্রাক্তন প্রধান শিক্ষকের পুনর্বহাল! পুরুলিয়ার স্কুলে বিক্ষোভ

নিউজ ডেস্ক; স্কুল ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ প্রায় ২০ লক্ষ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এক সময় সাসপেন্ড ও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন প্রাক্তন
resizeplus_Screenshot 2026-09-02 131853_edited

নিউজ ডেস্ক; স্কুল ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ প্রায় ২০ লক্ষ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এক সময় সাসপেন্ড ও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক। সেই শিক্ষককেই ফের পুরনো স্কুলে যোগদানের নির্দেশ ঘিরে তীব্র উত্তেজনা ছড়াল পুরুলিয়ার মানবাজার-১ ব্লকের বনমহড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। অভিযুক্ত প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক প্রণব মণ্ডলের পুনর্বহালের খবর সামনে আসতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন পড়ুয়াদের অভিভাবক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, আর কোনও ভাবেই ওই শিক্ষককে স্কুলে ঢুকতে দেওয়া হবে না।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বনমহড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন তৈরির জন্য কয়েক বছর আগে সরকারি অর্থ বরাদ্দ হয়েছিল। সেই অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ২০ লক্ষ টাকা। অভিযোগ, সেই টাকা দীর্ঘদিন স্কুলের একটি যৌথ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা ছিল। কিন্তু জমি সংক্রান্ত জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ে স্কুল ভবন তৈরির কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরে জমি সংক্রান্ত সমস্যা মিটিয়ে স্কুল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে ওই অর্থের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।

অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে আসে তৎকালীন প্রধান শিক্ষক প্রণব মণ্ডলের নাম। অভিযোগ, ২০২৩ সালে তৎকালীন এক সহ-শিক্ষিকার স্বাক্ষর জাল করে স্কুলের তহবিল থেকে প্রায় ২০ লক্ষ টাকা তুলে নেওয়া হয়। ওই টাকা আত্মসাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে তদন্ত শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে প্রণব মণ্ডলকে সাসপেন্ড করা হয় এবং তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।

ঘটনার সূত্রপাত আরও কয়েক বছর আগে। ২০১৪ সালে বনমহড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে বরাদ্দ অর্থ তৎকালীন প্রধান শিক্ষক প্রণব মণ্ডল এবং এক সহকারী শিক্ষকের নামে থাকা যৌথ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়েছিল। কিন্তু স্কুল ভবন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি নিয়ে সমস্যা দেখা দেওয়ায় সেই সময় কাজ এগোয়নি। ফলে সরকারি বরাদ্দের টাকা অ্যাকাউন্টেই পড়ে ছিল।

পরে জমি সংক্রান্ত জটিলতা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠার পর স্কুলের নতুন ভবন তৈরির বিষয়ে উদ্যোগী হন শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্থানীয়রা। সেই সময়ই স্কুলের তহবিলে থাকা অর্থের হিসাব নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসে বলে অভিযোগ। কী ভাবে বরাদ্দ টাকা খরচ হয়েছে, কার অনুমতিতে টাকা তোলা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট নথিতে কারা সই করেছেন—এই সব বিষয় নিয়ে শুরু হয় আলোচনা।

অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, তদন্তে তৎকালীন এক সহ-শিক্ষিকার স্বাক্ষর জাল করার বিষয়টিও সামনে আসে। ওই স্বাক্ষর ব্যবহার করে স্কুলের তহবিল থেকে বড় অঙ্কের টাকা তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরই প্রণব মণ্ডলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যদিও অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তের বক্তব্য এই মুহূর্তে পাওয়া যায়নি।

এরই মধ্যে নতুন করে বিতর্কের সূত্রপাত গত ২৪ অগস্ট। পুরুলিয়া জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের তরফে প্রণব মণ্ডলকে ফের বনমহড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়েই কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। দীর্ঘদিন পর একই স্কুলে তাঁর পুনর্বহালের খবর এলাকায় পৌঁছতেই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। অভিভাবক এবং গ্রামবাসীদের একাংশ প্রশ্ন তোলেন, গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে যাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তাঁকেই আবার একই বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালনের সুযোগ কেন দেওয়া হচ্ছে?

সোমবার প্রণব মণ্ডলের স্কুলে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত দিনে তিনি বিদ্যালয়ে আসেননি। কেন তিনি যোগ দিতে এলেন না, সে বিষয়েও তাঁর কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর স্কুলে ফেরার সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই বিদ্যালয়ের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এক সময় সেখানে বিক্ষোভও দেখানো হয়।

বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় শুধু পড়াশোনার জায়গা নয়, গ্রামের মানুষের কাছে সেটি বিশ্বাসের প্রতিষ্ঠান। সেখানে শিশুদের শিক্ষা এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভূমিকা। তাই স্কুলের তহবিলের টাকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এমন কাউকে ফের ওই বিদ্যালয়ে দায়িত্ব দিলে অভিভাবকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হবে।

গ্রামের বাসিন্দা মধুসূদন বাউড়ি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রণব মণ্ডল যখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন, তখন বিদ্যালয়ের নিজস্ব ভবন ছিল না। খোলা মাঠে ক্লাস করতে হত পড়ুয়াদের। তাঁর দাবি, সেই সময় স্কুলের তহবিলে প্রায় ২০ লক্ষ টাকা পড়ে থাকলেও শিশুদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে ভবন নির্মাণ করা হয়নি। বরং ওই টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় আর এক বাসিন্দা বেহুলা বাউড়ির প্রশ্ন, “ওই শিক্ষককে আর কী ভাবে বিশ্বাস করব আমরা?” তাঁর বক্তব্য, স্কুলের অর্থ নিয়ে যদি এমন অভিযোগ ওঠে, তা হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে ফের একই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব দেওয়ার আগে অভিভাবকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও প্রশাসনের ভাবা উচিত।

বনমহড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক প্রশান্ত বাউড়িও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, প্রণব মণ্ডলের যোগদানের বিষয়ে এখনও তাঁর কাছে কোনও লিখিত সরকারি নির্দেশ এসে পৌঁছয়নি। ফলে সরকারি ভাবে কোনও নির্দেশ হাতে না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না।

প্রশ্ন উঠছে, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের নির্দেশ কার্যকর হলে প্রণব মণ্ডল কোথায় এবং কী দায়িত্ব নিয়ে কাজ করবেন। বিশেষ করে যে বিদ্যালয়ের তহবিল সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এতদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে, সেখানেই তাঁকে ফেরানোর সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হল, তা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

গ্রামবাসীদের একাংশের দাবি, পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হোক। তাঁদের বক্তব্য, স্কুলের অর্থ সংক্রান্ত অভিযোগের সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত শিক্ষককে একই বিদ্যালয়ে দায়িত্ব দেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। অন্য দিকে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়ে থাকলে তার আইনি ও দাপ্তরিক ভিত্তি কী, সেটিও প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন বলে দাবি তাঁদের।

সব মিলিয়ে প্রণব মণ্ডলের পুনর্বহাল ঘিরে বনমহড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন করে তৈরি হয়েছে চাপা উত্তেজনা। এক দিকে রয়েছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের পুনরায় কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ, অন্য দিকে স্থানীয় অভিভাবক ও গ্রামবাসীদের তীব্র আপত্তি। অভিযুক্ত শিক্ষক আদৌ কবে স্কুলে যোগ দেবেন, এবং তাঁর যোগদানের ক্ষেত্রে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে—এখন সেদিকেই নজর স্থানীয়দের।

No Comments

তাজা খবর

আরও পড়ুন

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved