
নিউজ ডেস্ক; মানস সরোবর দর্শনের উদ্দেশ্যে নেপাল হয়ে যাত্রা করেছিলেন দুর্গাপুরের বামুনাড়ার বাসিন্দা অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রী মৌসুমি গঙ্গোপাধ্যায়। কিন্তু নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান ও ভূমিধসের বিপর্যয়ের পর থেকেই তাঁদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। পরিবারের সদস্য এবং প্রতিবেশীরা বার বার ফোন করেও কোনও সাড়া পাচ্ছেন না। ফলে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে গঙ্গোপাধ্যায় পরিবারে।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, একটি ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে মানস সরোবর যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন অরিন্দম ও মৌসুমি। নেপাল হয়ে তাঁদের চিনে প্রবেশ করার কথা ছিল। যাত্রার আগে পর্যন্ত পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল তাঁদের। এমনকি বিপর্যয়ের মাত্র দু’দিন আগেও ফোনে কথা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা। কিন্তু নেপালে হড়পা বান আছড়ে পড়ার পর আচমকাই তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
ঘটনার পর থেকেই উদ্বিগ্ন পরিবার বার বার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করছে। কিন্তু ফোনে কোনও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কেও নিশ্চিত কোনও তথ্য পরিবারের হাতে নেই। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে বুধবার রাতে গঙ্গোপাধ্যায় বাড়িতে যায় পুলিশ। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি প্রতিবেশীদের কাছ থেকেও অরিন্দম ও মৌসুমির যাত্রা সংক্রান্ত তথ্য জানতে চাওয়া হয়।
পুলিশের তরফে পরিবারের সদস্য এবং প্রতিবেশীদের জানানো হয়েছে, কোনও ভাবে ওই দম্পতির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হলে যেন দ্রুত পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। ফলে এখন কোনও সূত্রের অপেক্ষায় রয়েছে পরিবার এবং স্থানীয় বাসিন্দারা।
অরিন্দমদের প্রতিবেশী গৌতম অধিকারী জানান, একটি ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে মানস সরোবর যাওয়ার জন্য বেরিয়েছিলেন অরিন্দম ও মৌসুমি। বিপর্যয়ের আগে তাঁদের সঙ্গে ফোনে কথাও হয়েছিল। কিন্তু বুধবারের দুর্যোগের পর তাঁদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে পরিবার এবং প্রতিবেশীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
শুধু দুর্গাপুরের এই দম্পতিই নন, নেপালের ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর আরও এক বাঙালি পর্যটকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর সামনে এসেছে। তারকেশ্বরের বাসিন্দা স্নেহাশিস দত্তও নেপালে আটকে রয়েছেন বলে তাঁর পরিবার জানিয়েছে। বুধবার রাত থেকে তাঁর সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, ৩২ জনের একটি পর্যটক দলের সঙ্গে মানস সরোবরের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন স্নেহাশিস। গত ২১ অগস্ট দলটি যাত্রা শুরু করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী নেপাল হয়ে চিনে প্রবেশ করার কথা ছিল তাঁদের। ২২ অগস্ট তাঁরা কাঠমান্ডু পৌঁছন। এরপর নির্ধারিত রুটে এগিয়ে যাচ্ছিল দলটি।
স্নেহাশিসের পরিবারের সদস্যদের দাবি, বুধবার ফোনে তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল। তখন তিনি এবং তাঁর দলের সদস্যরা নেপাল-চিন সীমান্তের কাছে ছিলেন। কিন্তু এরপরই এলাকায় হড়পা বানের বিপর্যয় ঘটে। দুর্যোগের পর থেকে স্নেহাশিসের ফোনে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাঁর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে এখনও পরিবারের কাছে কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছয়নি।
জানা গিয়েছে, ৩২ জনের ওই পর্যটক দলের অধিকাংশই কলকাতার বাসিন্দা। দলের মধ্যে ৩০ জন কলকাতার বাসিন্দা বলে সূত্রের খবর। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন তারকেশ্বরের স্নেহাশিস এবং ট্যুর ম্যানেজার জয়ন্ত সান্যাল। ফলে দলের প্রত্যেক সদস্যের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বুধবার সকালে নেপালের রাসুয়া এবং নুয়াকোট জেলায় ভয়াবহ হড়পা বানের জলস্রোত আছড়ে পড়ে। প্রবল জলের তোড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাস্তা, বাড়িঘর-সহ বিভিন্ন পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যাহত হয়েছে। বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধারকারী দলগুলি বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি চালাচ্ছে।
নেপাল পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ১৬২টি দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও বহু মানুষের কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় ৫৯৮ বলে সূত্রের খবর। তাঁদের মধ্যে অন্তত ১৩৩ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন বলে সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে। ফলে নেপালে থাকা ভারতীয় পর্যটক ও যাত্রীদের পরিবারের উদ্বেগও বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ইতিমধ্যেই জরুরি হেল্পলাইন নম্বর চালু করেছে। নেপালে থাকা বা আটকে পড়া রাজ্যের বাসিন্দাদের পরিবারের সদস্যরা প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য ০৩৩-২৪৭৯ ৩৩১১ এবং ৯১৪৭৮৯০১৮১ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারবেন বলে জানানো হয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের তরফেও ভারতীয় নাগরিকদের সহায়তার জন্য নেপালে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের যোগাযোগ নম্বর প্রকাশ করা হয়েছে। সেই নম্বরগুলি হল +৯৭৭৯৮৫১৩১৬৮০৭ এবং +৯৭৭৯৭০৯১০৭৫০০।
দুর্যোগের পর যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় নিখোঁজ পর্যটকদের পরিবারের উৎকণ্ঠা আরও বেড়েছে। দুর্গাপুরের অরিন্দম ও মৌসুমি এবং তারকেশ্বরের স্নেহাশিস—তিনজনেরই দ্রুত সন্ধান পাওয়ার অপেক্ষায় পরিবার এবং প্রতিবেশীরা। উদ্ধারকারী দল ও প্রশাসনের তৎপরতায় তাঁদের নিরাপদে খুঁজে পাওয়ার আশাতেই এখন দিন গুনছেন স্বজনেরা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments