Last updated: August 26th, 2026 at 11:57 pm

নিউজ ডেস্ক: পুণ্য অর্জনের আশায় দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে কৈলাস-মানস সরোবর দর্শনের স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেই আধ্যাত্মিক যাত্রাই যে মাঝপথে এমন এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে, তা ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারেননি পুণ্যার্থীরা। প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপালে আচমকা আছড়ে পড়া বিধ্বংসী হড়পা বানের (Flash Flood) কবলে পড়ে এবার নিখোঁজ হলেন কলকাতার ৩২ জন। নিখোঁজ এই দলটিতে রয়েছেন ৩০ জন পর্যটক এবং তাঁদের দেখভালের দায়িত্বে থাকা কলকাতার একটি বেসরকারি ভ্রমণ সংস্থার দুই অভিজ্ঞ ম্যানেজার। বুধবার সকাল থেকে এই ৩২ জনের দলের সঙ্গে সমস্ত রকম যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। নেপালের পাহাড়ি নদীগুলোর রুদ্রমূর্তির কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। এই খবর কলকাতায় এসে পৌঁছাতেই নিখোঁজ পর্যটকদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে চরম আতঙ্ক এবং বুকফাটা কান্নার রোল উঠেছে। সময়ের কাঁটা যত এগোচ্ছে, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মেঘ ততই গাঢ় হচ্ছে নিখোঁজদের স্বজনদের মনে।
জানা গিয়েছে, কলকাতার একটি সুপরিচিত ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমেই এই ৩০ জন পর্যটকের দলটি বহু প্রতীক্ষিত কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে এক জন আদতে ভারতীয় নাগরিক হলেও তিনি সুদূর আমেরিকা থেকে শুধুমাত্র এই তীর্থযাত্রায় অংশ নেওয়ার জন্যই কলকাতায় এসেছিলেন। ভ্রমণ সংস্থার দেওয়া নির্দিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ অগস্ট, শুক্রবার তাঁরা কলকাতা থেকে নেপালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। পরদিন, অর্থাৎ ২২ অগস্ট তাঁরা নিরাপদে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে গিয়ে পৌঁছান। মঙ্গলবার কাঠমান্ডু থেকে এই দলের এক সদস্য সেখানকার মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবিও পাঠিয়েছিলেন পরিবারের লোকজনকে। তখনও পর্যন্ত কে জানত, প্রকৃতির এই শান্ত রূপের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক ভয়ংকর প্রলয়!
ভ্রমণ সংস্থা এবং প্রশাসনিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, বুধবার সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্ত (Nepal-Tibet Border) পেরোনোর জন্য দলটি রাসুয়াগাধি (Rasuwagadhi) নামক এলাকার দিকে অগ্রসর হয়। ওই দিন সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ তাঁরা রাসুয়াগাধির ইমিগ্রেশন অফিসে (Immigration Office) পৌঁছান সীমান্ত পারাপারের প্রয়োজনীয় সরকারি কাজ মেটানোর জন্য। আর ঠিক সেই সময়েই ঘটে যায় চরম বিপর্যয়। আচমকা পাহাড়ের ওপর থেকে প্রবল জলোচ্ছ্বাস নিয়ে আছড়ে পড়ে প্রলয়ংকরী হড়পা বান। চোখের পলকে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা কাদা, পাথর আর জলের সেই বিধ্বংসী স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যায় ইমিগ্রেশন অফিস সহ আশেপাশের সবকিছু। এই ভয়াবহ ঘটনার পর থেকেই ওই ৩২ জনের সঙ্গে আর কোনোভাবেই যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে স্যাটেলাইট যোগাযোগ— সবকিছুই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে।
কলকাতার ওই ভ্রমণ সংস্থার অন্যতম আধিকারিক দিব্যজ্যোতি বসু সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, কাঠমান্ডুর ‘সম্রাট ট্রাভেল এজেন্সি’ নামক একটি আন্তর্জাতিক মানের সংস্থা এই পুরো ট্যুরের ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিকসের দায়িত্বে ছিল। ওই ৩০ জন পর্যটকের সঙ্গে সর্বদা ছায়ার মতো ছিলেন কলকাতার এজেন্সির দুই ম্যানেজার— জয়ন্ত সান্যাল এবং নৃপেন সরকার। এই দুই ম্যানেজারের মোবাইল নম্বরে আন্তর্জাতিক রোমিং পরিষেবা চালু করা ছিল, যাতে যেকোনো পরিস্থিতিতে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। দিব্যজ্যোতিবাবু জানান, “বুধবার সকাল আটটা নাগাদ জয়ন্ত ও নৃপেনের সঙ্গে আমাদের শেষবার ফোনে কথা হয়েছিল। তাঁরা জানিয়েছিলেন সকলে সুস্থ আছেন এবং বর্ডার পেরোনোর প্রস্তুতি চলছে। পর্যটকদের মধ্যে কেউ কেউ নাকি সেই সময় চরম উৎসাহে ফেসবুক লাইভও করছিলেন। কিন্তু ঠিক তার কিছু সময় পরেই হড়পা বানের সেই ভয়ংকর খবরটি আসে। এরপর থেকে তাঁদের ফোন আর বেজে ওঠেনি।”
উদ্ধারকার্যের বিষয়ে ওই ভ্রমণ সংস্থার তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, কাঠমান্ডুর সংশ্লিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সির নিজস্ব হেলিকপ্টার রয়েছে। খবর পাওয়া মাত্রই তারা উদ্ধারকাজের জন্য হেলিকপ্টার নিয়ে ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল। কিন্তু আবহাওয়া এতটাই প্রতিকূল এবং পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, কপ্টারটি সেখানে অবতরণ করতেই পারেনি। আকাশপথ থেকে শুধু জলের তোড় আর ধ্বংসলীলার দৃশ্যই চোখে পড়েছে। ইতিমধ্যেই কলকাতার ভ্রমণ সংস্থার তরফ থেকে নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড এবং ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে বুধবার রাত গড়িয়ে বৃহস্পতিবার হয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত নিখোঁজ পর্যটকদের কোনো সুনির্দিষ্ট খবর বা অবস্থান সম্পর্কে প্রশাসন কিছুই জানাতে পারেনি।
এদিকে, নেপালের এই হড়পা বানের প্রভাব শুধু কলকাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রশাসনিক সূত্রের একটি পরিসংখ্যান রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। জানা গিয়েছে, নেপালের এই প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এখনও পর্যন্ত মোট ১০৫ জন ভারতীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আর এর মধ্যে সব চেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই নিখোঁজ ১০৫ জনের মধ্যে ৭১ জনই হলেন পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা! কলকাতার পাশাপাশি হুগলির চন্দননগর এবং উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের বেশ কয়েকজন বাসিন্দাও নেপালে বেড়াতে গিয়ে এই ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যে আটকে পড়েছেন বলে খবর পাওয়া গিয়েছে। রাজ্য সরকারের তরফ থেকে ইতিমধ্যেই বিদেশ মন্ত্রকের সঙ্গে নিরন্তর যোগাযোগ রেখে নিখোঁজ বঙ্গসন্তানদের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
নেপালে এই মুহূর্তে বন্যা পরিস্থিতি কার্যত সিনেমাকেও হার মানাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে প্রকৃতির এক ভয়ংকর ধ্বংসলীলা। পাহাড়ি নদীর জলস্তর বিপদসীমার অনেক ওপর দিয়ে বইছে। ইতিমধ্যেই নেপালে অন্তত ৯৫ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে সেদেশের প্রশাসন। এই হড়পা বানের জল ক্রমশ নিচের দিকে নামতে থাকায় ভারতের বিহার ও উত্তরপ্রদেশেও চরম সতর্কতা (High Alert) জারি করা হয়েছে। বিশেষ করে গণ্ডক নদীর জলস্তর হু হু করে বাড়তে থাকায় বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে, প্রকৃতির এই রোষানলে পড়ে মানস সরোবর যাত্রীদের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। বাড়ির প্রিয় মানুষটি সুস্থ অবস্থায় ঘরে ফিরে আসুক, এখন শুধু সেই প্রার্থনাই করছেন কলকাতার নিখোঁজ ৩২ জনের পরিবার-পরিজনরা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments