Last updated: August 26th, 2026 at 11:26 pm

নিউজ ডেস্ক: বর্তমান বিশ্বে যখন দিকে দিকে অসহিষ্ণুতা, বিভেদ এবং সাম্প্রদায়িক অশান্তির নানা খবর প্রায়শই সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম দখল করে নেয়, ঠিক সেই অস্থির আবহে দাঁড়িয়ে সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক অনন্য নজির গড়ল নদিয়া জেলার ঐতিহ্যবাহী শহর শান্তিপুর। ধর্মের নামে যখন এক শ্রেণির মানুষ সমাজকে বিভক্ত করার চক্রান্তে লিপ্ত, তখন ধর্মেরই আসল সুর— মানবতা ও ভালোবাসার বার্তাকে পাথেয় করে শান্তিপুরে অনুষ্ঠিত হল এক বর্ণাঢ্য এবং তাৎপর্যপূর্ণ ‘সর্বধর্ম মিলন উৎসব’। শান্তিপুর কারবালা কমিটির বিশেষ উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্প্রীতির মঞ্চে সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে এক ছাতার তলায় এসে দাঁড়ালেন হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টান ধর্মের বিশিষ্ট প্রতিনিধিরা। তাঁদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই মহামিলন উৎসবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শামিল হলেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের সাধারণ মানুষ, যা বাংলার চিরাচরিত ধর্মনিরপেক্ষতা ও পারস্পরিক সহাবস্থানের সংস্কৃতিকে আরও একবার উজ্জ্বল করে তুলল।
শ্রীচৈতন্যদেবের পুণ্যস্মৃতি বিজড়িত শান্তিপুর শহর বরাবরই বৈষ্ণব ধর্ম, সংস্কৃতি এবং সম্প্রীতির এক পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত। সেই মাটিতে দাঁড়িয়ে কারবালা কমিটির এই অভিনব উদ্যোগ যেন শহরের মুকুটে এক নতুন পালক যোগ করেছে। জানা গিয়েছে, এই দিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন ধর্মের বিশিষ্ট আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ও সমাজকর্মীরা। বর্ণময় এই মঞ্চে একসঙ্গে উপবিষ্ট ছিলেন বাগআঁচড়া রামকৃষ্ণ সারদা আশ্রমের পরম শ্রদ্ধেয় স্বামী দুর্গেশানন্দ মহারাজ, রাঘবপুর চার্চের ফাদার সরোজ বিশ্বাস এবং বিশিষ্ট ইসলামীয় ধর্মতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব মাওলানা মোশারফ হোসেন। একই মঞ্চে গেরুয়া বসনধারী সন্ন্যাসী, শ্বেতশুভ্র পোশাকের ফাদার এবং ইসলাম ধর্মের গুরুর এই অপূর্ব সহাবস্থান উপস্থিত দর্শকদের মনে এক গভীর রেখাপাত করে। এই অভূতপূর্ব দৃশ্য যেন মনে করিয়ে দেয় স্বামী বিবেকানন্দের সেই বিখ্যাত শিকাগো বক্তৃতার কথা, যেখানে তিনি সব ধর্মের মিলনের কথা বলেছিলেন। এ ছাড়া জনপ্রতিনিধি হিসেবে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শান্তিপুরের বিজেপি বিধায়ক স্বপন কুমার দাস। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সকলেই এদিন এক সুরে মানবতার জয়গান গেয়েছেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে উপস্থিত ধর্মগুরু এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের অত্যন্ত জোরালো বার্তা দেন। বক্তারা তাঁদের সুচিন্তিত ভাষণে স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দেন যে, কোনও ধর্মই কখনও মানুষের মধ্যে বিভেদের প্রাচীর তৈরি করতে শেখায় না। প্রতিটি ধর্মেরই মূল নির্যাস হলো ভালোবাসা, ত্যাগ, মানবিকতা এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা করা। মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার মেলবন্ধনই পারে একটি সুস্থ, সবল ও উন্নত সমাজ গড়ে তুলতে। বক্তাদের মতে, শান্তিপুরের মতো একটি ইতিহাস ও ঐতিহ্যমণ্ডিত শহরে এই ধরনের সর্বধর্ম সম্মেলনের আয়োজন শুধুমাত্র স্থানীয় স্তরে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং গোটা রাজ্যের কাছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও ইতিবাচক বার্তা প্রেরণ করবে।
উদ্যোক্তাদের পক্ষে শান্তিপুর কারবালা কমিটির অন্যতম সদস্য ইনসান আলি এই মহৎ উদ্যোগের প্রাসঙ্গিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একে অপরের ধর্ম, উৎসব ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে পারলেই সমাজ থেকে সমস্ত রকম ভেদাভেদ দূর হবে। সর্বধর্ম সম্মেলনের মতো এই উদ্যোগ সেই সম্প্রীতির বন্ধনকে আগামী দিনে আরও সুদৃঢ় করবে বলেই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।” তাঁর এই বক্তব্যকে করতালির মাধ্যমে স্বাগত জানান উপস্থিত দর্শকরা।
আজকের দিনে যখন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মেরুকরণের চর্চা লেগেই থাকে, তখন শান্তিপুরের এই মঞ্চ যেন এক দমকা মলয় বাতাস নিয়ে এল। উপস্থিত সাধারণ দর্শকরা, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, এই অনুষ্ঠান থেকে এক বিরাট শিক্ষা গ্রহণ করেছেন বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের এই অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ শান্তিতে বাঁচতে চায়। চার্চের ফাদারের কথায় যখন যীশুর প্রেমের বাণী ঝরে পড়েছে, রামকৃষ্ণ আশ্রমের মহারাজের কথায় তখন ধ্বনিত হয়েছে ‘যত্র জীব তত্র শিব’-এর মহান আদর্শ। অন্যদিকে, মাওলানা সাহেবের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে ইসলামের শান্তির দর্শন। আর এই সব দর্শনের মেলবন্ধনেই রচিত হয়েছে এক নতুন মানবতার ইস্তেহার।
সমগ্র অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সুচারুভাবে সঞ্চালনা করেন বর্ষীয়ান সাংবাদিক তথা প্রখ্যাত ‘সমাজের প্রতিচ্ছবি’ পত্রিকার সম্পাদক সত্যনারায়ণ গোস্বামী। তাঁর সাবলীল উপস্থাপনা এবং প্রাসঙ্গিক বক্তব্য সমগ্র অনুষ্ঠানটিকে আরও আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত করে তোলে। অনুষ্ঠানের একেবারে শেষলগ্নে উপস্থিত সকলের মধ্যে শান্তি, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের এক অটুট বন্ধন বজায় রাখার উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়। সব মিলিয়ে শান্তিপুরের এই সর্বধর্ম মিলন উৎসব প্রমাণ করে দিল, বাংলার মাটিতে বিভেদের চেয়ে ঐক্যের সুর আজও অনেক বেশি জোরালো।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments