Last updated: August 26th, 2026 at 06:13 pm

নিউজ ডেস্ক: গ্রামীণ প্রতিকূলতা কিংবা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা— কোনো কিছুই যে অদম্য ইচ্ছাশক্তির সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, তা আরও একবার প্রমাণ করে দিল পশ্চিম মেদিনীপুরের সবংয়ের মেয়েরা। কেবল আত্মরক্ষার প্রাথমিক পাঠ নেওয়াতেই সীমিত থাকেনি তারা, বরং রিংয়ের ভেতরে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করে জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরেছে। সম্প্রতি খড়গপুরে আয়োজিত ‘অল ইন্ডিয়া ওপেন ফুল কন্ট্যাক্ট ক্যারাটে ন্যাশনাল টুর্নামেন্ট-২০২৬’-এ অংশ নিয়ে সাফল্য অর্জন করেছে সবংয়ের একদল তরুণী। এদের মধ্যে বন্যা জানা, ভূমিকা পাত্র, সম্প্রীতি সামন্ত ও পূর্বা ঘোড়ইদের নাম এখন পুরো এলাকায় চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। সবংয়ের ‘সূর্য মার্শাল আর্ট অ্যাকাডেমি’র প্রতিভাবান এই খেলোয়াড়েরা খড়গপুরের মাটি থেকে ঝুলিতে পুরে এনেছে একাধিক ট্রফি ও আর্থিক সম্মাননা।
গত শনি ও রবিবার খড়গপুর কলেজের সুবিশাল স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণে আয়োজিত হয়েছিল জাতীয় স্তরের এই মেগা ক্যারাটে প্রতিযোগিতা। টুর্নামেন্টে দেশের প্রায় ১০টি ভিন্ন রাজ্য থেকে ৪০০ জনেরও বেশি প্রতিযোগী অংশ নিয়েছিলেন। সেই কঠিন লড়াইয়ের মঞ্চেই নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করে সবংয়ের তেমাথানির ‘সূর্য মার্শাল আর্ট অ্যাকাডেমি’। অ্যাকাডেমির প্রশিক্ষক সূর্যকান্ত পালের নেতৃত্বে মোট ৩০ জন প্রতিযোগী এই টুর্নামেন্টে যোগ দেন। তার মধ্যে ১২ জন প্রতিযোগী বিভিন্ন বিভাগে প্রথম, দ্বিতীয়সহ একাধিক শীর্ষ স্থান অধিকার করে পদক ও ট্রফি জয় করেছেন। বাকিরা কোনো পদক না পেলেও প্রতিপক্ষের সঙ্গে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে ক্রীড়াপ্রেমীদের নজর কেড়েছেন।
প্রতিযোগিতায় ১৬ বছরের ঊর্ধ্বে ওপেন লাইট ওয়েট বিভাগে অসামান্য নৈপুণ্য দেখিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন বন্যা জানা। ট্রফির পাশাপাশি তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে নগদ ১ হাজার টাকার পুরস্কার। একইসঙ্গে ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের ফাইট বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদক ও সমপরিমাণ নগদ অর্থ পেয়েছে ভূমিকা পাত্র। অন্যদিকে ‘কাতা’ বিভাগে নজরকাড়া পারফর্ম করে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন অনুভব বর। স্ট্রেচিং বা শারীরিক নমনীয়তার পরীক্ষায় সেরা হয়ে ট্রফি ও নগদ ১ হাজার টাকা জেতেন পূর্বা ঘোড়ই। এছাড়াও সম্প্রীতি সামন্ত, ইশান সরেন, কৌশিকী মণ্ডল, ঈশিতা দণ্ডপাট, ঈশানী মণ্ডল, শ্রেয়ান জানা, প্রিয়াঙ্কা পাত্র এবং শ্রেয়স সিংরা নিজ নিজ বিভাগে দ্বিতীয়, চতুর্থ ও ষষ্ঠ স্থান অধিকার করে মেদিনীপুরের মুখ উজ্জ্বল করেছে।
আজকের ডিজিটাল যুগে যখন গ্রামীণ যুবসমাজও ক্রমেই স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চুয়াল জগতে আসক্ত হয়ে পড়ছে, ঠিক সেই সময়ে মাঠমুখো হয়ে ক্যারাটের মতো কঠিন ক্রীড়ামাধ্যমে মেয়েদের এই সাফল্যকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন শিক্ষাবিদরা। স্থানীয় সবংয়ের শিক্ষক অরিজিৎ দাস অধিকারী উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে জানান, “বর্তমান সময়ে কচি-কাঁচারা যেভাবে মোবাইলের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগের। আমরা চাই তারা এসব ছেড়ে খেলার মাঠে ফিরে আসুক। খেলাধুলো ও সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে মন ও শরীর গঠন করুক। সবংয়ের এই ক্যারাটে অ্যাকাডেমি সেই দিশা দেখানোর ক্ষেত্রে সত্যিই এক অনবদ্য ও প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে।”
নিজের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে দশম শ্রেণীর বিজয়ী ছাত্রী ভূমিকা পাত্র জানায়, “বর্তমান দিনে প্রতিটি মেয়ের জন্যই আত্মরক্ষার কৌশল শেখা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের গ্রামে আগে এই ধরনের সুযোগ ছিল না। এখন সূর্যকান্ত স্যরের প্রশিক্ষণে আমরা নিজেদের তৈরি করার সুযোগ পাচ্ছি।” অন্যদিকে, ছাত্রীদের এই সাফল্য নিয়ে গর্বিত কোচ সূর্যকান্ত পাল জানান, “মাত্র আড়াই বছরের কঠোর প্রশিক্ষণে এই সাফল্য এসেছে। আমি চাই সবংয়ের মতো প্রান্তিক এলাকার প্রতিটি ঘরে ঘরে ছেলেমেয়েরা ক্যারাটে শিখুক। এতে যেমন স্বাস্থ্য ভালো থাকবে, ঠিক তেমনই আত্মরক্ষা ও জাতীয় স্তরে ক্যারাটেতে সুনাম অর্জনের বিরাট সুযোগ রয়েছে। আশা করছি আগামী দিনে এখান থেকে আরও অনেক বড় মাপের খেলোয়াড় তুলে আনতে পারব।”
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments