
নিউজ ডেস্ক; বেসরকারি নেশামুক্তি কেন্দ্রের এক আবাসিককে রাস্তায় ফেলে বেধড়ক মারধরের অভিযোগ উঠল। অভিযোগের তির সরাসরি ওই নেশামুক্তি কেন্দ্রের বিরুদ্ধেই। গুরুতর জখম হয়েছেন জাফর ইমাম নামে এক যুবক। ঘটনাটি হুগলির উত্তরপাড়া পুরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের ভদ্রকালী এলাকার। সোমবার রাতে জাফরকে রাস্তায় ফেলে মারধর করা হচ্ছে দেখে ছুটে আসেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁরাই খবর দেন উত্তরপাড়া থানায়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে জাফরকে উদ্ধার করে উত্তরপাড়া স্টেট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। বর্তমানে সেখানেই তাঁর চিকিৎসা চলছে বলে জানা গিয়েছে।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভদ্রকালী এলাকার ওই নেশামুক্তি কেন্দ্রকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের অশান্তি লেগে রয়েছে। তাঁদের দাবি, প্রায় প্রতিদিনই কেন্দ্রের ভিতর থেকে ঝামেলা, চিৎকার এবং গোলমালের শব্দ শোনা যায়। বিশেষ করে রাতের দিকে আবাসিকদের চেঁচামেচিতে এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
বাসিন্দাদের আরও দাবি, এর আগেও ওই নেশামুক্তি কেন্দ্রকে ঘিরে একাধিক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সোমবার রাতের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। তাঁদের বক্তব্য, একজন আবাসিককে প্রকাশ্য রাস্তায় ফেলে যেভাবে মারধর করা হচ্ছিল, তা দেখে তাঁরা আর চুপ করে থাকতে পারেননি। স্থানীয়রাই এগিয়ে এসে বিষয়টি থামানোর চেষ্টা করেন এবং পরে পুলিশকে খবর দেন।
আহত জাফর ইমামের অভিযোগ, নেশামুক্তি কেন্দ্রের ভিতরেই নিয়মিত নেশার কারবার চলে। তাঁর দাবি, বাইরে থেকে হেরোইন এবং ‘পাতা’ জাতীয় নেশার সামগ্রী নিয়মিত কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। এই ধরনের কার্যকলাপের প্রতিবাদ করেছিলেন তিনি। আর সেই কারণেই তাঁকে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ জাফরের।
জাফরের আরও অভিযোগ, মারধরের পর তাঁকেই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়। তাঁর দাবি, কেন্দ্রের ভিতরে কী ধরনের কার্যকলাপ চলছে, তা নিয়ে আপত্তি জানানোয় তাঁর উপর ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। এরপরই তাঁকে মারধরের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ।
অন্যদিকে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। তাঁদের প্রশ্ন, জাফর ইমাম যদি সত্যিই অপরাধী হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁকে প্রায় চার বছর ধরে ওই নেশামুক্তি কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল কেন? স্থানীয়দের দাবি, জাফরকে ওই কেন্দ্রে ড্রাইভার হিসেবেও কাজে লাগানো হতো। ফলে তাঁকে হঠাৎ করে ‘অপরাধী’ হিসেবে দাবি করার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
বাসিন্দাদের একাংশের আরও অভিযোগ, নেশা ছাড়ানোর উদ্দেশ্যে তৈরি হওয়া একটি কেন্দ্রে যদি নেশার কারবার এবং নিয়মিত অশান্তির মতো অভিযোগ ওঠে, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁদের দাবি, ওই কেন্দ্রের কার্যকলাপ প্রশাসনের তরফে ভালোভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এলাকায় শান্তি ও স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে নেশামুক্তি কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেওয়ার দাবিও তুলেছেন স্থানীয়দের একাংশ।
তবে স্থানীয় বাসিন্দা এবং আহত যুবকের অভিযোগের সম্পূর্ণ বিপরীত দাবি করেছেন ওই নেশামুক্তি কেন্দ্রের প্রেসিডেন্ট অতনু সরকার। তাঁর বক্তব্য, জখম আবাসিক জাফর ইমাম নিজেই একজন অপরাধী। অতনু সরকারের অভিযোগ, জাফর তাঁর গলা থেকে সোনার চেন ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। সেই সময়ই তাঁর সঙ্গে জাফরের ধস্তাধস্তি হয়। তবে জাফরকে কেউ মারধর করেনি বলেই দাবি করেছেন তিনি।
ফলে একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ আলাদা। একদিকে জাফরের অভিযোগ, নেশার কারবারের প্রতিবাদ করায় তাঁকে মারধর করা হয়েছে। অন্যদিকে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের দাবি, সোনার চেন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন জাফর এবং সেই কারণেই ধস্তাধস্তি হয়। ঠিক কী কারণে ওই রাতে জাফরের সঙ্গে ঘটনাটি ঘটেছিল, তা এখন তদন্তসাপেক্ষ।
এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও নজর রয়েছে স্থানীয়দের। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহত যুবককে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। তাঁর শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখাও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয়দের বক্তব্য, কেন্দ্রের অন্যান্য আবাসিকদের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
একইসঙ্গে নেশামুক্তি কেন্দ্রের ভিতরে সত্যিই কোনও ধরনের নিষিদ্ধ নেশার কারবার চলত কি না, সেই অভিযোগও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। বাইরে থেকে হেরোইন বা ‘পাতা’ নিয়ে আসার যে অভিযোগ জাফর করেছেন, তারও সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা অত্যন্ত গুরুতর বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
অন্যদিকে, কেন্দ্রের প্রেসিডেন্টের তরফে জাফরের বিরুদ্ধে যে সোনার চেন ছিনতাইয়ের অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেটিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে। সত্যিই এমন কোনও ঘটনা ঘটেছিল কি না, তার কোনও প্রত্যক্ষদর্শী বা প্রমাণ রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, উত্তরপাড়ার ভদ্রকালী এলাকায় নেশামুক্তি কেন্দ্রকে ঘিরে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। আবাসিককে প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনা থেকে শুরু করে নেশার কারবার, দীর্ঘদিন ধরে আবাসিককে আটকে রাখা এবং সোনার চেন ছিনতাইয়ের পাল্টা অভিযোগ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যথেষ্ট জটিল। এখন পুলিশের তদন্তেই স্পষ্ট হবে, সোমবার রাতে আসলে কী ঘটেছিল এবং কার অভিযোগের কতটা সত্যতা রয়েছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments