Homeহুগলিউত্তরপাড়ারেল কোচ তৈরিতে টিটাগড়ের নয়া উদ্যোগ

রেল কোচ তৈরিতে টিটাগড়ের নয়া উদ্যোগ

নিউজ ডেস্ক: উত্তরপাড়ায় যাত্রীবাহী রেল ব্যবস্থার জন্য নতুন ‘ডিজ়াইন অ্যান্ড অপারেশনস সেন্টার’ চালু করল টিটাগড় রেল সিস্টেমস লিমিটেড। শুক্রবার সংস্থার
Untitled design (16)

নিউজ ডেস্ক: উত্তরপাড়ায় যাত্রীবাহী রেল ব্যবস্থার জন্য নতুন ‘ডিজ়াইন অ্যান্ড অপারেশনস সেন্টার’ চালু করল টিটাগড় রেল সিস্টেমস লিমিটেড। শুক্রবার সংস্থার উত্তরপাড়া কারখানা চত্বরে নতুন কেন্দ্রটির উদ্বোধন করেন রাজ্যের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী তাপস রায় এবং শ্রম ও পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিংহ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংস্থার ভাইস চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর উমেশ চৌধুরী-সহ সংস্থার শীর্ষ আধিকারিকরা। নতুন এই কেন্দ্রকে ঘিরে সংস্থার নকশা, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং অপারেশন সংক্রান্ত কাজ আরও শক্তিশালী হবে বলে জানানো হয়েছে।

টিটাগড়ের উত্তরপাড়া ইউনিট ইতিমধ্যেই দেশের রেল ও মেট্রো কোচ তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে। সংস্থার নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, উত্তরপাড়া কারখানায় মেট্রো রেল, যাত্রীবাহী ট্রেন এবং বন্দে ভারত স্লিপার প্রকল্পের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ চলছে। ২০২৫ সালে এখানেই ভারতীয় রেলের জন্য বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেন তৈরির নির্দিষ্ট উৎপাদন লাইন চালু করা হয়েছিল।

নতুন ডিজ়াইন অ্যান্ড অপারেশনস সেন্টার চালুর ফলে উৎপাদনের পাশাপাশি ট্রেনের নকশা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজও আরও সমন্বিত ভাবে করা সম্ভব হবে বলে সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ শুধু কোচ তৈরি নয়, রেল ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও নকশা তৈরির ক্ষেত্রেও উত্তরপাড়াকে আরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

টিটাগড়ের উত্তরপাড়া কারখানায় বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের আধুনিক রেল কোচ তৈরির কাজ হচ্ছে। সংস্থার বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এখান থেকে বেঙ্গালুরু, সুরাট এবং আমদাবাদ মেট্রোর প্রকল্পের পাশাপাশি বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনের জন্যও উৎপাদন চলছে। সংস্থার উত্তরপাড়া ইউনিটে স্টিল এবং অ্যালুমিনিয়াম—দুই ধরনের কোচ তৈরির সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজও হয়েছে।

বিশেষ করে বন্দে ভারত স্লিপার প্রকল্পকে ঘিরে উত্তরপাড়ার গুরুত্ব গত কয়েক বছরে অনেকটাই বেড়েছে। টিটাগড় রেল সিস্টেমস এবং ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেড বা BHEL-এর যৌথ উদ্যোগে ৮০টি বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনসেট তৈরির চুক্তি রয়েছে। প্রতিটি ট্রেনসেটে ১৬টি করে কোচ থাকবে। প্রকল্পটির মোট মূল্য দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ-সহ প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা বলে সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে।

উত্তরপাড়ার কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। সংস্থার বিনিয়োগকারী উপস্থাপনায় দেখা যাচ্ছে, যাত্রীবাহী রেল কোচ তৈরির বর্তমান ক্ষমতা বছরে প্রায় ৩০০ কোচ থেকে ধাপে ধাপে ৮৫০ কোচে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি কারখানায় আধুনিক প্রযুক্তি এবং Industry 4.0-ভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থাও তৈরি করা হচ্ছে।

এদিনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় বাংলায় শিল্প ও কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, টিটাগড়ের মতো সংস্থার সম্প্রসারণ রাজ্যের শিল্প পরিকাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক রেল কোচ এবং মেট্রো কোচ তৈরির মতো ক্ষেত্রে বাংলায় উৎপাদন বাড়লে তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।

শ্রম ও পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিংহও শিল্পোন্নয়ন এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে রাজ্যে নতুন করে শিল্প বিনিয়োগ আনার প্রসঙ্গ উঠে আসে। শিল্পের সঙ্গে পরিবহণ পরিকাঠামোর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সংস্থার পক্ষ থেকেও বাংলায় উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। নতুন ডিজ়াইন সেন্টারকে সেই বৃহত্তর পরিকল্পনারই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংস্থার লক্ষ্য, যাত্রীবাহী রেল ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশীয় প্রযুক্তি ও উৎপাদন ক্ষমতা আরও বাড়ানো।

উত্তরপাড়ায় টিটাগড়ের সম্প্রসারণের সঙ্গে স্থানীয় কর্মসংস্থানের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থার কারখানা এবং তার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পরিষেবার মাধ্যমে বহু মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। উৎপাদন ক্ষমতা বাড়লে ভবিষ্যতে এই পরিসর আরও বাড়তে পারে বলে শিল্পমহলের একাংশের আশা।

এর আগেও উত্তরপাড়া ইউনিটে বড় বিনিয়োগ এবং পরিকাঠামো সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারখানার পাশে অতিরিক্ত জমি নিয়ে উৎপাদন ও ট্রেন পরীক্ষার পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও করা হয়েছে। ওই সম্প্রসারণের ফলে কোচ উৎপাদনের পাশাপাশি ট্রেনের পরীক্ষা ও কমিশনিংয়ের কাজ আরও সহজ হবে বলে সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।

টিটাগড়ের রেল ব্যবসার ইতিহাসও বেশ দীর্ঘ। সংস্থার নিজস্ব কর্পোরেট তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালে ওয়াগন উৎপাদনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করার পর ধীরে ধীরে যাত্রীবাহী রেল ব্যবস্থায় প্রবেশ করে তারা। ২০০৭ সাল থেকে ভারতীয় রেলের জন্য যাত্রীবাহী ট্রেন সংক্রান্ত উৎপাদনেও সংস্থার উপস্থিতি রয়েছে। পরবর্তী সময়ে মেট্রো, EMU/MEMU, অ্যালুমিনিয়াম কোচ এবং আধুনিক যাত্রীবাহী রেল ব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের পরিসর বাড়িয়েছে টিটাগড়।

বর্তমানে দেশের রেল পরিবহণে আধুনিকীকরণের যে গতি তৈরি হয়েছে, তার ফলে কোচ ও ট্রেন তৈরির ক্ষেত্রে দেশীয় সংস্থাগুলির সামনে বড় বাজার তৈরি হচ্ছে। মেট্রো রেল সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে বন্দে ভারত এবং অন্যান্য আধুনিক ট্রেন—সব ক্ষেত্রেই নতুন প্রযুক্তি ও বেশি উৎপাদন ক্ষমতার প্রয়োজন হচ্ছে। সেই বাজারকে সামনে রেখেই উত্তরপাড়ায় টিটাগড়ের নতুন কেন্দ্রের গুরুত্ব বাড়ছে।

নতুন ডিজ়াইন অ্যান্ড অপারেশনস সেন্টার তাই শুধু একটি নতুন ভবন চালুর ঘটনা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রযুক্তি, নকশা, উৎপাদন ক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের রেল প্রকল্পে আরও বড় ভূমিকা নেওয়ার পরিকল্পনা। উত্তরপাড়াকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেল উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।

এখন নজর থাকবে নতুন কেন্দ্র থেকে কী ধরনের প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং নকশা তৈরি হয়, পাশাপাশি উত্তরপাড়া কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা কতটা বাড়ে তার দিকে। বন্দে ভারত স্লিপার, মেট্রো এবং অন্যান্য যাত্রীবাহী রেল প্রকল্পে টিটাগড়ের ভূমিকা যত বাড়বে, ততই বাংলার শিল্প মানচিত্রে উত্তরপাড়ার গুরুত্বও বাড়তে পারে।

No Comments

তাজা খবর

আরও পড়ুন

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved