Homeজেলাবন্যেরা বনে সুন্দর’, কিন্তু বনই নেই! হাওড়ায় বিপন্ন মেছো বিড়াল, উঠছে সোশ্যাল ফরেস্টের দাবি

বন্যেরা বনে সুন্দর’, কিন্তু বনই নেই! হাওড়ায় বিপন্ন মেছো বিড়াল, উঠছে সোশ্যাল ফরেস্টের দাবি

eisamay_2026-09-28_qqnocijf_Howrah-News

নিউজ ডেস্ক: ‘বন্যেরা বনে সুন্দর’—কথাটা সহজ হলেও হাওড়ার ক্ষেত্রে বাস্তব ছবিটা একেবারেই অন্যরকম। বন্যপ্রাণের বৈচিত্রে সমৃদ্ধ এই জেলায় আজও নেই কোনও পূর্ণাঙ্গ সোশ্যাল ফরেস্ট রেঞ্জ। পাশের হুগলির আরামবাগে সামাজিক বনসৃজনের উদ্যোগ থাকলেও, হাওড়ায় দীর্ঘদিন ধরে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের দাবিতে সরব পরিবেশকর্মীরা। তাঁদের বক্তব্য, দ্রুত সংরক্ষিত বনাঞ্চল বা কমিউনিটি ফরেস্ট তৈরি না হলে আগামী দিনে জেলার একাধিক বন্যপ্রাণী কার্যত বিলুপ্তির মুখে পড়তে পারে।

পরিবেশকর্মীদের দাবি, হাওড়ার গর্ব মেছো বিড়াল বা বাঘরোল থেকে শুরু করে বনবিড়াল, গন্ধগোকুল, হিমালয়ান ঝুঁটিবিহীন শজারু, মনিটর লিজার্ড-সহ একাধিক প্রজাতি রয়েছে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে। হাওড়া ‘নন-ফরেস্ট এরিয়া’ হলেও বন্যপ্রাণের বৈচিত্র কোনও অংশে কম নয়।

জেলার ১৪টি ব্লককে বন দপ্তর দু’টি রেঞ্জে ভাগ করেছে—হাওড়া আরবান রেঞ্জ এবং উলুবেড়িয়া রেঞ্জ। আরবান রেঞ্জের পাঁচলা, ডোমজুড় ও জগৎবল্লভপুর এলাকায় মেছো বিড়াল-সহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর দেখা মেলে। অন্যদিকে উলুবেড়িয়া রেঞ্জের আমতার দু’টি ব্লক, বাগনানের দু’টি ব্লক, শ্যামপুরের দু’টি ব্লক এবং উলুবেড়িয়া এলাকাতেও বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি রয়েছে।

কিন্তু নিরাপদ আবাসস্থলের অভাবই এখন বড় চিন্তার কারণ। পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা মানুষের সঙ্গে সংঘাতের জেরে বহু বন্যপ্রাণীর মৃত্যু হয়। বন দপ্তর ও পরিবেশ সংগঠনগুলি উদ্ধার ও সংরক্ষণের কাজে যুক্ত থাকলেও মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমানো যাচ্ছে না।

হাওড়া জেলা যৌথ পরিবেশ মঞ্চের সভাপতি তথা পরিবেশকর্মী সম্রাট মণ্ডলের বক্তব্য, জেলার বন্যপ্রাণীদের অস্তিত্ব রক্ষায় সংরক্ষিত বনাঞ্চল তৈরি জরুরি। তাঁর প্রস্তাব, জেলার উপযুক্ত জায়গা চিহ্নিত করে কমিউনিটি ফরেস্ট গড়ে তোলা যেতে পারে। পাশাপাশি রেসকিউ ও রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার তৈরির প্রয়োজন রয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় থাকা খাসজমিও এই কাজে ব্যবহার করা সম্ভব বলে তাঁর দাবি।

প্রাক্তন বন আধিকারিক বিজনবিহারী মজুমদারের মতে, বন দপ্তর, সিভিল প্রশাসন এবং পঞ্চায়েত বিভাগকে একসঙ্গে মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন করে উপযুক্ত জমি চিহ্নিত করতে হবে। রূপনারায়ণ বা দামোদরের নদীতীরবর্তী এলাকা, এমনকি খালপাড়ের জমিও এই ধরনের বন তৈরির জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে প্রাক্তন এক বনকর্তার মতে, ঘনবসতিপূর্ণ হাওড়ায় বড় আকারের সোশ্যাল ফরেস্ট তৈরি করা সহজ নয়। একটি বনাঞ্চলের জন্য অন্তত ২০০ থেকে ৩০০ একর জমি প্রয়োজন হতে পারে। অন্যদিকে ওয়াইল্ড লাইফ এনভায়রনমেন্ট সেভিয়ার ট্রাস্টের সদস্য চিত্রক প্রামাণিকের মতে, জেলার নদীতীরবর্তী জমিগুলি চিহ্নিত করে ছোট ছোট বনাঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

এর আগে বাগনানের বাঙালপুর ও হাটুরিয়া-২ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ জমিতে মেছো বিড়ালের জন্য অভয়ারণ্য তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত থমকে যায়। বন দপ্তরের এক কর্তার কথাতেও জানা গিয়েছে, একটা সময়ে সোশ্যাল ফরেস্ট তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও বর্তমানে সেই কাজ বন্ধ।

অথচ ১৯৯২ সালে সামাজিক বনসৃজনে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য হাওড়া জেলা ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী বৃক্ষামিত্র পুরস্কার পেয়েছিল। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত জেলায় সামাজিক বনসৃজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বন দপ্তরের। তাই অতীতে যে জেলায় সামাজিক বনসৃজন সম্ভব হয়েছিল, সেখানে এখন কেন সেই উদ্যোগ থমকে রয়েছে—এই প্রশ্নই তুলছেন পরিবেশকর্মীরা। তাঁদের দাবি, দ্রুত পরিকল্পিত বনাঞ্চল তৈরি না হলে হাওড়ার বন্যপ্রাণ বাঁচানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়বে।

No Comments

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved