
নিউজ ডেস্ক: পুজোর মুখে ফের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ডেঙ্গি। চলতি বছরের শুরু থেকে গত শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩২০। উদ্বেগের বড় কারণ, আক্রান্তদের মধ্যে আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ সংক্রমিত হয়েছেন শুধুমাত্র গত দু’সপ্তাহে। ফলে উৎসবের মরসুম শুরু হওয়ার আগেই ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের সামনে তৈরি হয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জ।
জেলা-ভিত্তিক পরিসংখ্যানে সংক্রমণের নিরিখে এখনও শীর্ষে রয়েছে মুর্শিদাবাদ। সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২ হাজারের কাছাকাছি। মুর্শিদাবাদের পরেই রয়েছে কলকাতা। এরপর তালিকায় রয়েছে নদিয়া এবং উত্তর ২৪ পরগনা। দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় প্রতিদিনই নতুন করে শতাধিক মানুষ ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসও পরিস্থিতিকে কিছুটা জটিল করে তুলেছে। কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গে আগামী কয়েক দিনে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। ফলে টানা বৃষ্টির পরে জমে থাকা জল নতুন বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও কম। আর সেই জমা জলই ডেঙ্গির বাহক এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা স্বাস্থ্য দপ্তরের।
বিশেষ করে পুজোর আগে বিভিন্ন এলাকায় মণ্ডপ তৈরির কাজ এখন পুরোদমে চলছে। নির্মীয়মাণ মণ্ডপের বিভিন্ন অংশ, বাঁশের কাঠামো, প্লাস্টিকের ত্রিপল কিংবা আশপাশের নিচু জায়গায় বৃষ্টির জল জমে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই জমা জল নিয়মিত পরিষ্কার না হলে সেখানে মশার লার্ভা জন্মানোর আশঙ্কা থাকছে। স্বাস্থ্য ভবনের কর্তাদের একাংশের মতে, পুজোর প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গে এই বিষয়টিও প্রশাসনের নজরে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
এই পরিস্থিতিতে সোমবার নবান্নে ডেঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি প্রশাসনিক বৈঠক করেন মুখ্যসচিব মনোজকুমার আগরওয়াল। বৈঠকে রাজ্যের বিভিন্ন জেলার পরিস্থিতি, আক্রান্তের সংখ্যা এবং মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—ডেঙ্গি মোকাবিলায় কোনও ধরনের গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না।
স্বাস্থ্য ভবন সূত্রে খবর, অক্টোবর এবং নভেম্বর মাসকে ‘হাই-রিস্ক পিরিয়ড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই দুই মাসে ডেঙ্গি সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে কি না, তা নিয়ে বিশেষ নজরদারি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জেলা প্রশাসনগুলিকে। আক্রান্তদের দ্রুত চিহ্নিত করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং মশার লার্ভা ধ্বংসের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সচেতন করার উপরেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ও সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ডেঙ্গির ভয়াবহতা এবং মৃত্যু ঠেকাতে রাজ্য সরকার সবরকম ব্যবস্থা নিচ্ছে। কারও শরীরে ডেঙ্গির উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। সরকারি ব্যবস্থায় বিনামূল্যে চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে বলেও জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
ডেঙ্গি মোকাবিলায় সরকারি হাসপাতালগুলির পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে অতিরিক্ত ১ কোটি ২৩ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বলে স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে। হাসপাতালগুলিতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরিষেবা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রস্তুতি বজায় রাখার উপরেও জোর দেওয়া হয়েছে।
কলকাতাতেও ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পদক্ষেপ শুরু করেছে কলকাতা পুরসভা। পুজোর মণ্ডপগুলিতে নজরদারি চালাতে তৈরি হয়েছে বিশেষ মনিটরিং সেল। পুর কমিশনার স্মিতা পান্ডের নেতৃত্বে ওই সেল মহানগরের বিভিন্ন পুজো মণ্ডপ এবং তার আশপাশের এলাকায় নিয়মিত নজরদারি চালাবে। কোথাও জল জমে রয়েছে কি না, সেই জলে মশার লার্ভা রয়েছে কি না এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা হচ্ছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।
পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগের আধিকারিকদের একাংশের আশঙ্কা, শহরের বহু জায়গায় ইতিমধ্যেই মণ্ডপ তৈরির কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। নির্মাণকাজের সামগ্রী, প্লাস্টিক, ড্রাম বা অন্যান্য পাত্রে বৃষ্টির জল জমে থাকতে পারে। একই সঙ্গে মণ্ডপের আশপাশের নিচু জায়গাতেও জল জমার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে পুজোর আগে থেকেই ওই সব জায়গায় নিয়মিত নজরদারি চালানো প্রয়োজন।
প্রশাসনের তরফে অবশ্য জানানো হয়েছে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা এখনও প্রায় অর্ধেক। তবে সেই পরিসংখ্যানকে স্বস্তির কারণ হিসেবে দেখছে না স্বাস্থ্য দপ্তর। কারণ, সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত সময়কে ডেঙ্গির সংক্রমণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে এই মুহূর্তে সামান্য অসতর্কতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।
পুজোর আগে তাই একদিকে যেমন মণ্ডপ ও তার আশপাশের জমা জল দ্রুত সরানোর কাজ চলছে, তেমনই মশার লার্ভা ধ্বংস এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের লক্ষ্য একটাই—উৎসবের মরসুমে ডেঙ্গির সংক্রমণ যেন নতুন করে মাথাচাড়া দিতে না পারে। সাধারণ মানুষকেও বাড়ির আশপাশে জল জমতে না দেওয়া এবং জ্বর বা ডেঙ্গির উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।
পুজোর আনন্দে যাতে ডেঙ্গির আতঙ্ক ছায়া না ফেলে, সেই লক্ষ্যেই এখন স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে পুরসভা এবং জেলা প্রশাসন—সব পক্ষকেই বাড়তি সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments