Homeজেলাপুজোর চাঁদার ফাঁকেই বাল্যবিবাহ রোধের বার্তা, বাড়ি বাড়ি ‘অপরাজিতা’ ক্লাবের মহিলারা

পুজোর চাঁদার ফাঁকেই বাল্যবিবাহ রোধের বার্তা, বাড়ি বাড়ি ‘অপরাজিতা’ ক্লাবের মহিলারা

eisamay_2026-10-08_syy2xaqb_iStock-1491447434-2

নিউজ ডেস্ক : তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর এক হাতে চাঁদার খাতা, অন্য হাতে পুজোর আমন্ত্রণপত্র। বাড়ির দরজায় দরজায় ঘুরছেন এক দল মহিলা। উদ্দেশ্য শুধু দুর্গাপুজোর চাঁদা সংগ্রহ নয়, তার সঙ্গে সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার বিরুদ্ধে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া। পুজোর কথা বলতে বলতেই তাঁরা খোঁজ নিচ্ছেন এলাকার কিশোরীদের পড়াশোনার। কোথাও আবার অভিভাবকদের বোঝাচ্ছেন, কম বয়সে মেয়ের বিয়ে দিলে তার পড়াশোনা, স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতের উপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

তমলুকের শহিদ মাতঙ্গিনী ব্লকের ডিমারি গ্রামের ‘অপরাজিতা’ ক্লাবের মহিলা সদস্যদের এই উদ্যোগ ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে। দুর্গাপুজোর চাঁদা সংগ্রহের কাজকেই তাঁরা ব্যবহার করছেন বাল্যবিবাহ রোধের সামাজিক প্রচারের মাধ্যম হিসেবে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুজোর আমন্ত্রণ জানানোর পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলছেন তাঁরা। তাঁদের মূল আবেদন, মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে না দিয়ে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়া হোক।

পুজোর মরসুমে সাধারণত বিভিন্ন ক্লাবের সদস্যরা চাঁদা সংগ্রহে ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু ডিমারি গ্রামের এই মহিলারা সেই পরিচিত ছবিতে কিছুটা অন্য মাত্রা যোগ করেছেন। চাঁদার খাতা নিয়ে বাড়িতে পৌঁছনোর পর কথার প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে তাঁরা জানতে চাইছেন, বাড়ির মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে কি না। পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গিয়েছে কি না, অল্প বয়সে বিয়ের কোনও পরিকল্পনা রয়েছে কি না—সেই বিষয়েও পরিবারের সঙ্গে কথা বলছেন তাঁরা।

অভিভাবকদের বোঝাতে গিয়ে মহিলারা বলছেন, বাল্যবিবাহ কোনও পরিবারের সমস্যাই নয়, এটি একটি সামাজিক সমস্যা। কম বয়সে বিয়ে হলে একটি মেয়েকে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হতে পারে। পাশাপাশি অল্প বয়সে সংসারের দায়িত্ব এবং মাতৃত্বের চাপও তার উপর পড়ে। এর ফলে তার স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বিয়ের পরিবর্তে শিক্ষার উপর গুরুত্ব দেওয়ার আবেদন জানাচ্ছেন ‘অপরাজিতা’ ক্লাবের সদস্যরা।

ক্লাবের মহিলাদের বক্তব্য, শুধু প্রশাসনিক প্রচার বা পোস্টার দিয়ে বাল্যবিবাহ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। পরিবারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা প্রয়োজন। গ্রামের মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকায় পুজোর সময়টাকেই সেই কাজের জন্য বেছে নিয়েছেন তাঁরা। কারণ এই সময়ে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কোনও না কোনও ভাবে পুজোর প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয়। সেই সুযোগেই সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া সহজ হচ্ছে।

তাঁদের এই উদ্যোগে স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশও উৎসাহ দেখাচ্ছেন। পুজোর চাঁদা দিতে আসা সদস্যদের কাছ থেকে বাল্যবিবাহ নিয়ে নানা তথ্য জানছেন অভিভাবকেরা। কোথাও মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে, কোথাও আবার অল্প বয়সে বিয়ের ক্ষতিকর দিক নিয়ে দীর্ঘ কথাবার্তা চলছে। ফলে পুজোর আনন্দের আবহেই সামাজিক সচেতনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামে।

‘অপরাজিতা’ ক্লাবের সদস্যদের মতে, একটি মেয়ের ভবিষ্যৎ শুধু বিয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই মেয়েদের স্কুলে পাঠানো এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য পরিবারগুলিকে উৎসাহিত করাই তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য।

দুর্গাপুজোর চাঁদা সংগ্রহের মতো সাধারণ একটি সামাজিক কর্মকাণ্ডকে এ ভাবে সচেতনতার প্রচারে ব্যবহার করার উদ্যোগ প্রশংসা কুড়িয়েছে স্থানীয় মহলেও। পুজো শেষ হয়ে গেলেও এই প্রচার যাতে থেমে না যায়, সেই পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। কারণ বাল্যবিবাহ রুখতে এক দিনের প্রচারের বদলে নিয়মিত সামাজিক উদ্যোগই বেশি কার্যকর হতে পারে।

উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার বিরুদ্ধে এমন উদ্যোগ যে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে পারে, ডিমারি গ্রামের ‘অপরাজিতা’ ক্লাবের মহিলাদের কর্মকাণ্ড তারই উদাহরণ। চাঁদার খাতা হাতে বাড়ি বাড়ি ঘোরার পাশাপাশি তাঁদের বার্তা একটাই—মেয়ের বিয়ে নয়, আগে নিশ্চিত হোক তার শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ।

No Comments

    একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

    LINKS

    ABOUT US

    ফোন নম্বর

    +৯১ ৮৪২০৬৫৮৯৯৯

    আমাদের ঠিকানা

    আর্চ স্কোয়ার X2 বিল্ডিং
    কলেজ মোড়, সেক্টর ৫
    কলকাতা - ৭০০০৯১

    Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved