Homeজেলারানাঘাটে সিটিজেন ফোরামের উদ্যোগে সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যাসাগরের আবক্ষ মূর্তি

রানাঘাটে সিটিজেন ফোরামের উদ্যোগে সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যাসাগরের আবক্ষ মূর্তি

resizeplus_Vidyasagar

নিউজ ডেস্ক: উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের অন্যতম কাণ্ডারী, নারীশিক্ষার অকৃত্রিম দিশারী এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের বুকে যুক্তির আলো জ্বালানো মহাপুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আজও বাঙালির মনন ও চিন্তায় এক অন্তহীন প্রেরণার নাম। তাঁর জন্ম ও প্রয়াণ দিবস পালন করা বাঙালির এক দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও আবেগঘন ঐতিহ্য। তবে প্রথাগত স্মরণসভার গণ্ডি পেরিয়ে এবার নদীয়া জেলার ঐতিহ্যবাহী রানাঘাট শহরে রচিত হলো এক নয়া ঐতিহাসিক অধ্যায়। শহরের স্বনামধন্য ও অত্যন্ত সক্রিয় নাগরিক সংগঠন ‘সিটিজেন ফোরাম’-এর ঐকান্তিক উদ্যোগে এবং সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টায় রানাঘাটের বুকে সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত হলো দয়ার সাগরের একটি পূর্ণাঙ্গ আবক্ষ মূর্তি। শুধু একটি মূর্তি স্থাপন নয়, বরং এর মধ্য দিয়ে আগামী প্রজন্মের সামনে এক আপসহীন সমাজসংস্কারকের আদর্শকে চিরস্থায়ী রূপ দেওয়ার এক অনন্য নজির গড়ল এই নাগরিক সংগঠনটি।

দিনটির সূচনা হয়েছিল এক বর্ণাঢ্য ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশের মধ্য দিয়ে। ভোরবেলার স্নিগ্ধ আলো ফুটতেই রানাঘাট শহরের রাজপথে ঢল নামে আবালবৃদ্ধবনিতার। সিটিজেন ফোরামের ডাকে সাড়া দিয়ে আয়োজিত হয় এক সুদীর্ঘ ও সুশৃঙ্খল প্রভাতফেরি। হাতে প্ল্যাকার্ড, কণ্ঠে বিদ্যাসাগরের বন্দনা এবং পরনে ঐতিহ্যবাহী পোশাক— সব মিলিয়ে এক সাংস্কৃতিক জাগরণের সাক্ষী থাকে গোটা শহর। রানাঘাট শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা, মোড় এবং বাজার এলাকা পরিক্রমা করে এই সুদৃশ্য শোভাযাত্রাটি। নারীশিক্ষা, কুসংস্কার দূরীকরণ এবং বাংলা ভাষার প্রসারে বিদ্যাসাগরের যে অমূল্য অবদান, সেই বার্তাগুলি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াই ছিল এই প্রভাতফেরির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার পর শোভাযাত্রাটি এসে সমাপ্ত হয় শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বিনোদনী পার্ক সংলগ্ন প্রাঙ্গণে।

প্রভাতফেরি শেষে বিনোদনী প্রাঙ্গণেই এক বিশেষ ও মননশীল আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। এই সভার সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি ছিল আগামী প্রজন্মের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। রানাঘাট শহরের বিভিন্ন স্বনামধন্য বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এই আলোচনা চক্রে অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করে। কেবল শ্রোতা হিসেবে নয়, তারা মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষা, তাঁর আপসহীন সমাজসংস্কার এবং তাঁর সুদূরপ্রসারী চিন্তাধারা নিয়ে নিজেদের সুচিন্তিত বক্তব্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরে। আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে, যখন সমাজ ফের নানা ধরনের অবক্ষয় ও অন্ধবিশ্বাসের মুখোমুখি, তখন স্কুলপড়ুয়াদের মুখে বিদ্যাসাগরের যুক্তিবাদী দর্শনের কথা এক নতুন আশার সঞ্চার করে উপস্থিত দর্শকদের মনে। ছাত্রছাত্রীদের এই সাবলীল ও তথ্যসমৃদ্ধ বক্তব্য প্রমাণ করে যে, বিদ্যাসাগরের আদর্শ আজও বাংলার নতুন প্রজন্মের মধ্যে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও জীবন্ত।

অনুষ্ঠানের মূল পর্ব, অর্থাৎ নবনির্মিত আবক্ষ মূর্তিটির আনুষ্ঠানিক উন্মোচন পর্বটি ছিল রীতিমতো চাঁদের হাট। এক বর্ণাঢ্য ও রাজকীয় আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই পূর্ণাঙ্গ আবক্ষ মূর্তিটির আবরণ উন্মোচন করেন রাজ্যের দুই সম্মানীয় মন্ত্রী— স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী সুমনা সরকার এবং আবাসন প্রতিমন্ত্রী কবিতা মাঝি। তাঁদের হাত দিয়ে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সূচনা এক বিশেষ মাত্রা যোগ করে এই মেগা ইভেন্টে। কেবল মন্ত্রীরাই নন, এই স্মরণীয় এবং গৌরবময় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রানাঘাট উত্তর-পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক পার্থ সারথি চট্টোপাধ্যায়। উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক স্তরে খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী অসীম কান্তি দত্ত রায়, যাঁর উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে এক আলাদা বুদ্ধিবৃত্তিক গাম্ভীর্য প্রদান করে। এছাড়াও শহরের একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, সমাজসেবী, বিভিন্ন স্কুলের সম্মানীয় শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দ, বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী এবং সিটিজেন ফোরামের সকল সদস্য-সদস্যাবৃন্দ এই মাহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষী থাকতে বিনোদনী প্রাঙ্গণে উপস্থিত ছিলেন।

এই মূর্তি প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে থাকা ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে সিটিজেন ফোরামের অন্যতম প্রতিনিধি পরেশ নাথ কর্মকার এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সামনে জানান যে, অবিভক্ত নদীয়া এবং পার্শ্ববর্তী মুর্শিদাবাদ— এই দুই বৃহৎ ও ঐতিহাসিক জেলার মধ্যে রানাঘাটেই প্রথম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের এমন একটি সুদৃশ্য ও পূর্ণাঙ্গ আবক্ষ মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হলো। তাঁর এই দাবি ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই আপামর শহরবাসীর মনে এক প্রবল উচ্ছ্বাস ও গর্বের সৃষ্টি হয়েছে। পরেশবাবু আরও বলেন, এই মূর্তি নিছকই কোনও পাথরের ভাস্কর্য নয়, এটি রানাঘাটের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে এক নতুন মাইলফলক। প্রতিদিন এই পথ দিয়ে যাওয়া হাজার হাজার মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, এই মূর্তির দিকে তাকিয়ে বিদ্যাসাগরের সেই অদম্য জেদ, শিক্ষা বিস্তারের প্রতি তাঁর একাগ্রতা এবং সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর বজ্রকঠিন অবস্থানের কথা স্মরণ করবে।

সব মিলিয়ে, রানাঘাটের সিটিজেন ফোরামের এই বিশেষ উদ্যোগ কেবল একটি স্মরণসভার গণ্ডিতে আটকে থাকেনি, তা আক্ষরিক অর্থেই পরিণত হয়েছিল এক সামাজিক উৎসবে। যে মানুষটি নিজের গোটা জীবন বাংলার অন্ধকার দূর করতে এবং নারীশিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে নিঃস্বার্থভাবে ব্যয় করেছিলেন, তাঁর প্রতি এমন নিখাদ শ্রদ্ধাঞ্জলি গোটা সমাজকে এক ইতিবাচক বার্তা দিল। বিদ্যাসাগর মানেই শিরদাঁড়া সোজা করে বাঁচার এক নিরলস লড়াই, আর রানাঘাটের বুকে তাঁর এই নতুন আবক্ষ মূর্তি যেন সেই লড়াইয়েরই এক নীরব অথচ শক্তিশালী প্রতীক হয়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে রইল।

No Comments

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved