
নিউজ ডেস্ক: রাজ্য-রাজনীতিতে ক্ষমতার ঐতিহাসিক পালাবদল ঘটেছে প্রায় মাস চারেক আগে। নতুন সরকার শাসনভার গ্রহণ করার পরেই পূর্বতন সরকারের একাধিক নীতি, প্রকল্প এবং প্রশাসনিক প্রতীকের ওপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। যার মধ্যে অন্যতম এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপটি হলো পূর্বতন শাসকদলের অত্যন্ত পরিচিত, বহু চর্চিত এবং বিতর্কিত ‘বিশ্ব বাংলা’ লোগোর সরকারি ব্যবহারের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা। নবান্নের শীর্ষ মহল থেকে এই মর্মে কড়া নির্দেশিকাও জারি করা হয়েছে। কিন্তু সেই সরকারি নির্দেশিকাকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, খোদ প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের উপস্থিতিতে একটি সরকারি অনুষ্ঠানেই রমরমিয়ে ব্যবহৃত হলো নিষিদ্ধ সেই লোগো। ক্ষমতার পালাবদলের চার মাস পরেও সরকারি নির্দেশিকার এমন প্রকাশ্য এবং চূড়ান্ত লঙ্ঘন ঘিরে নদীয়া জেলার শান্তিপুরে প্রবল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্কের ঝড় উঠেছে।
চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে শান্তিপুর ব্লকের বেলগড়িয়া ১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার অন্তর্গত কৃত্তিবাস অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে। জানা গিয়েছে, পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আজ, অর্থাৎ ২৬ সেপ্টেম্বর, গোটা শান্তিপুর ব্লক জুড়েই অত্যন্ত সাড়ম্বরে পালিত হচ্ছে ‘অঙ্গন সেবা দিবস ২০২৬’। গ্রামীণ শিশু ও মহিলাদের স্বাস্থ্য এবং পুষ্টির দিকে নজরদারি বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই বিশেষ দিনটি পালন করা হয়। এই বিশেষ দিনটি উদযাপন করার জন্য কৃত্তিবাস অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রেও একটি সুপরিকল্পিত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শান্তিপুরের চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট অফিসার (CDPO) সায়নী গাঙ্গুলী সহ ব্লকের একাধিক প্রথম সারির অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী এবং সহায়িকারা। কিন্তু অনুষ্ঠানের শুরুতেই সকলের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায় একটি বিশেষ দৃশ্য দেখে। দেখা যায়, ওই সরকারি অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রায় প্রত্যেক অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী এবং সহায়িকার বুকে সযত্নে পিন দিয়ে আটকানো রয়েছে ‘বিশ্ব বাংলা’ লোগো ছাপানো একটি চকচকে ব্যাজ।
নতুন সরকার গঠনের এতগুলো দিন কেটে যাওয়ার পরেও, যেখানে সরকারি সমস্ত নথিপত্র, ব্যানার এবং হোর্ডিং থেকে এই লোগো মুছে ফেলার কাজ প্রায় শেষের পথে, সেখানে তৃণমূল স্তরের একটি সরকারি অনুষ্ঠানে কীভাবে এই লোগো ফিরে এল, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই একাধিক গুরুতর প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, নবান্ন থেকে জারি করা সরকারি নির্দেশিকা কি আদৌ শান্তিপুরের মতো ব্লক স্তরের অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছায়নি? নাকি প্রশাসনের শীর্ষ স্তরের নির্দেশিকা পাওয়ার পরেও জেনেশুনেই তা অমান্য করার দুঃসাহস দেখাচ্ছেন সিডিপিও সহ অন্যান্য স্থানীয় আধিকারিকরা?
এই চরম বিতর্কের মুখে পড়ে স্বাভাবিকভাবেই তীব্র অস্বস্তিতে পড়েছেন চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট অফিসার বা সিডিপিও সায়নী গাঙ্গুলী। সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা যখন তাঁকে এই সরকারি নিয়মভঙ্গের বিষয়ে প্রশ্ন করেন, তখন তিনি কার্যত উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল নেন। সিডিপিও স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, তিনি প্রশাসনিক স্তরে কোনও মুখপত্র বা স্পোকসপার্সন নন, তাই এই লোগো ব্যবহারের বিষয়ে তিনি সংবাদমাধ্যমের সামনে কোনওরকম প্রতিক্রিয়া দেবেন না। তাঁর এই নীরবতা প্রশাসনিক মহলের উদাসীনতাকেই আরও বেশি করে প্রকট করে তুলেছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। অন্যদিকে, অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাধারণ আইসিডিএস (ICDS) কর্মীরা প্রথমে মুখ খুলতে নারাজ হলেও, পরে ক্যামেরার আড়ালে তাঁরা জানান যে, এই নির্দিষ্ট লোগোটি ব্যবহার করা যে নিষিদ্ধ বা বেআইনি, সেই সংক্রান্ত কোনও লিখিত বা মৌখিক নির্দেশিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে তাঁদের কাছে এসে পৌঁছয়নি। ব্যাজগুলি তাঁদের পরতে দেওয়া হয়েছিল, তাই তাঁরা পরেছেন।
তবে এই বিতর্কের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো অনুষ্ঠানে উপস্থিত হেভিওয়েট প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিদের ভূমিকা। জানা গিয়েছে, কৃত্তিবাস অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের ওই অনুষ্ঠানে শান্তিপুরের বিডিও (BDO) সব্যসাচী রায়, স্থানীয় বিধায়ক, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি এবং সহ-সভাপতির মতো শীর্ষস্তরের কর্তাব্যক্তিরাও সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। আর বিস্ময়ের চরম সীমা অতিক্রম করে দেখা যায়, এই সমস্ত পদস্থ আধিকারিক এবং জনপ্রতিনিধিরাও ওই নিষিদ্ধ ‘বিশ্ব বাংলা’ লোগো লাগানো ব্যাজ বুকেই ধারণ করে অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন! ব্লক প্রশাসনের সর্বোচ্চ আধিকারিক হিসেবে খোদ বিডিও-র বুকে একটি নিষিদ্ধ লোগো কীভাবে জায়গা পেল, তা নিয়ে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে। এ বিষয়ে শান্তিপুরের বিডিও সব্যসাচী রায়কে প্রশ্ন করা হলে তিনি সম্পূর্ণ অজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, বিষয়টি আদৌ তাঁর জানা ছিল না এবং তিনি খেয়ালও করেননি। তবে বিতর্কের সূত্রপাত হওয়ার পর তিনি দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি। শান্তিপুর পঞ্চায়েত সমিতির সহকারী সভাপতি চঞ্চল চক্রবর্তী এই ঘটনার জন্য সরাসরি পূর্বতন সরকারের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আক্রমণ করেছেন। তিনি সংবাদমাধ্যমের সামনে চরম কটাক্ষের সুরে বলেন, “ওটি সরকারি কোনো লোগো ছিল না, ওটি ছিল ভাইপো লোগো। নতুন রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই তা ব্যান করে বা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। তবে এই লোগো ব্যবহারের ক্ষেত্রে গ্রামীণ স্তরের অঙ্গনওয়াড়ি সহায়িকা এবং কর্মীদের আমি কোনো দোষ দেখি না। সরকারি নির্দেশিকা হয়তো তাঁদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছায়নি বা তাঁরা এ বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ।” চঞ্চল চক্রবর্তীর এই ‘ভাইপো লোগো’ মন্তব্যটি যে পূর্বতন শাসকদলের এক শীর্ষ নেতাকে লক্ষ্য করেই ছোঁড়া হয়েছে, তা বুঝতে কারও বাকি নেই।
তবে রাজনৈতিক তরজার ঊর্ধ্বে উঠে যে প্রশ্নটি এখন সবচেয়ে বেশি সাধারণ মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো— সর্বক্ষেত্রে যখন এই লোগো ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তখন শান্তিপুরের সিডিপিও কেন অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী এবং সহায়িকাদের এ বিষয়ে আগে থেকে সতর্ক করলেন না? প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা কি এতটাই দুর্বল যে চার মাসেও একটি নিষেধাজ্ঞার খবর গ্রামীণ স্তরে পৌঁছায় না? পঞ্চায়েত সমিতির সহকারী সভাপতি আশ্বাস দিয়েছেন যে ব্লক প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে এই গাফিলতির বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হবে। তবে সরকারি নির্দেশিকার এমন প্রকাশ্য লঙ্ঘন এবং প্রশাসনিক আধিকারিকদের এই চূড়ান্ত উদাসীনতা ইতিমধ্যেই শান্তিপুরের প্রশাসনিক মহলে এক বিরাট বিতর্কের সৃষ্টি করেছে, যার জল আগামী দিনে আরও বহুদূর গড়াতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments