
নিউজ ডেস্ক: রাজ্যের গ্রামীণ এলাকাগুলিতে সাধারণ ও নিরীহ মানুষদের বোকা বানিয়ে প্রতারণার ফাঁদ পাতা যেন এখন এক শ্রেণির অসাধু চক্রের নিত্যদিনের পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কখনও ব্যাঙ্কের কেওয়াইসি (KYC) আপডেটের নাম করে, কখনও বা লটারির টিকিটে পুরস্কার জেতার টোপ দিয়ে সর্বস্বান্ত করা হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। তবে এবার খোদ সরকারি বার্ধক্য ভাতার টাকা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক অশীতিপর বৃদ্ধার সঙ্গে যে অভিনব ও দুঃসাহসিক জালিয়াতির ঘটনা ঘটল, তা শুনে কার্যত চোখ কপালে উঠেছে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের। দিনের আলোয়, প্রকাশ্য রাস্তায় এক বৃদ্ধাকে নিজের মোটরসাইকেলে বসিয়ে নির্জন এলাকায় নিয়ে গিয়ে তাঁর হাতের সোনার বালা হাতিয়ে চম্পট দিল এক প্রতারক। চাঞ্চল্যকর এবং শিউরে ওঠার মতো এই জালিয়াতির ঘটনাটি ঘটেছে বাবলা উত্তরপাড়া এলাকায়। এই ঘটনার পর থেকে ওই এলাকার বয়স্ক নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রতারণার শিকার হওয়া ওই বৃদ্ধার নাম গীতা পাল, বয়স আনুমানিক আশির কাছাকাছি। বাবলা উত্তরপাড়ারই দীর্ঘদিনের বাসিন্দা তিনি। রাজ্য সরকারের সামাজিক সুরক্ষা যোজনার অন্তর্গত বার্ধক্য ভাতা সংক্রান্ত বিষয়ে কিছু খোঁজখবর নেওয়ার প্রয়োজন ছিল তাঁর। সেই উদ্দেশ্যেই ঘটনার দিন সকালে কাউকে কিছু না জানিয়েই তিনি বাড়ি থেকে একাই বেরিয়েছিলেন নিকটবর্তী বাবলা পঞ্চায়েত অফিসের উদ্দেশে। পঞ্চায়েত অফিসের রাস্তা তাঁর চেনা, তাই পায়ে হেঁটেই গন্তব্যের দিকে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু মাঝপথেই ঘটে বিপত্তি। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আচমকাই কালো রঙের একটি মোটরসাইকেল নিয়ে এক অজ্ঞাতপরিচয় যুবক তাঁর পথ আটকায়। যুবকের মাথায় ছিল হেলমেট, যা দিয়ে তার মুখ প্রায় ঢাকা ছিল। সে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেকে সরকারি পরিষেবা প্রদানকারী এক আধিকারিক হিসেবে জাহির করে।
প্রতারক যুবক অত্যন্ত সুকৌশলে বৃদ্ধার বিশ্বাস অর্জন করতে শুরু করে। সে গীতা দেবীকে জানায় যে, তাঁর বার্ধক্য ভাতার টাকা ইতিমধ্যে সরকারি খাতায় চলে এসেছে এবং আজই সেই টাকা উপভোক্তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এই টাকা পেতে গেলে অবিলম্বে দরকারি কিছু নথিপত্র, বিশেষ করে আধার ও ভোটার কার্ড জমা করতে হবে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এবং সরকারি নিয়মের মারপ্যাঁচ সম্পর্কে অজ্ঞ গীতা দেবী যুবকের ফাঁদে পা দেন। টাকা পাওয়ার আশায় তিনি যুবকের কথা মতো তড়িঘড়ি বাড়িতে ফিরে যান ওই সমস্ত প্রয়োজনীয় সরকারি পরিচয়পত্র আনতে।
বাড়িতে গিয়ে নথিপত্র নিয়ে ওই বৃদ্ধা যখন পুনরায় রাস্তায় ফিরে আসেন, তখন সেই প্রতারক যুবক তাঁকে প্রস্তাব দেয় যে, বয়স্ক মানুষ হিসেবে তাঁর হেঁটে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, সে নিজের বাইকেই তাঁকে পঞ্চায়েত অফিসে নামিয়ে দেবে। সরকারি লোক ভেবে সরল বিশ্বাসে ওই অজ্ঞাতপরিচয় যুবকের কালো রঙের মোটরসাইকেলটিতে চেপে বসেন গীতা দেবী। কিন্তু এরপরই শুরু হয় আসল ষড়যন্ত্র। যুবক বাইকটি পঞ্চায়েতের দিকে না নিয়ে গিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে দিক পরিবর্তন করে। রাজাপুকুর পার হয়ে সে বাইক নিয়ে সোজা চলে যায় গন্ধখোলার দিকে যাওয়া একটি অপেক্ষাকৃত নির্জন ও শুনশান রাস্তায়।
সেই নির্জন জায়গায় পৌঁছনোর পর হঠাৎই গাড়ি থামিয়ে দেয় ওই যুবক। এবার সে ফাঁদে ফেলে তার আসল চালিকাশক্তি। সে বৃদ্ধাকে জানায় যে, সরকারি ভাতার টাকা পেতে গেলে মেশিনে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা টিপসই দিতে হবে। আর নিয়ম অনুযায়ী, হাতে কোনও ধাতব বস্তু বা সোনার গয়না থাকলে নাকি মেশিনে সেই টিপসই বা বায়োমেট্রিক স্ক্যান নেবে না! এই সম্পূর্ণ মনগড়া ও ভিত্তিহীন নিয়মের কথা শুনে বৃদ্ধা ঘাবড়ে যান। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই ওই প্রতারক বৃদ্ধার দুই হাত থেকে আনুমানিক ৬ গ্রাম ওজনের একজোড়া সোনার পেটি বা বালা কার্যত জোর করেই খুলে নেয়। বয়স্কা মহিলা কিছু বুঝে ওঠার বা বাধা দেওয়ার আগেই তাঁকে ওই একাকী নির্জন রাস্তায় ফেলে রেখে, বাইকের ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে চোখের নিমেষে হাওয়া হয়ে যায় ওই প্রতারক।
এই অভাবনীয় ঘটনায় চরম আতঙ্কিত ও হতভম্ব হয়ে পড়েন অশীতিপর গীতা দেবী। নির্জন রাস্তায় বেশ কিছুক্ষণ অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকার পর, কাঁদতে কাঁদতে কোনওরকমে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে তিনি নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। বাড়িতে এসে পরিবারের লোকজন ও প্রতিবেশীদের গোটা ঘটনার কথা বিস্তারিত জানান তিনি। বৃদ্ধার ছেলে বাদল পাল আক্ষেপের সুরে জানান, তাঁর মা কাউকে কিছু না জানিয়ে একাই পঞ্চায়েতে যাচ্ছিলেন, আর সেই সুযোগটাই নিয়েছে ওই দুষ্কৃতী। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রতারক সরকারি ভাতার কথা বললেও বৃদ্ধার নিয়ে যাওয়া আসল নথিপত্রগুলি সে ছুঁয়েও দেখেনি, তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল হাতের ওই সোনার গয়না জোড়া হাতিয়ে নেওয়া।
ঘটনার বিবরণ শোনার পরই পরিবার ও ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে অবিলম্বে স্থানীয় থানায় খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত গ্রামে পৌঁছে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশ আধিকারিকরা ঘটনাস্থল ও আশপাশের রাস্তার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে অভিযুক্ত বাইক চালককে চিহ্নিত করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন। প্রকাশ্য দিবালোকে বয়স্কদের টার্গেট করে এমন অভিনব কৌশলে দুঃসাহসিক প্রতারণার ঘটনা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে বয়স্ক নাগরিকদের সতর্ক করা হয়েছে, যাতে তাঁরা রাস্তায় অপরিচিত কোনও ব্যক্তির কথায় প্রলুব্ধ হয়ে এমনভাবে ফাঁদে পা না দেন। এই ধরনের সরাসরি জালিয়াতির হাত থেকে বাঁচতে পঞ্চায়েত স্তরে আরও বেশি করে সচেতনতা শিবিরের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সমাজকর্মীরা। গ্রামের সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হবে যে, কোনও সরকারি আধিকারিক বা পঞ্চায়েত কর্মী এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাতার টাকা দেওয়ার কথা বলেন না বা গয়না খোলার মতো হাস্যকর নির্দেশ দেন না। প্রতারকদের এই নতুন ছক থেকে বাঁচতে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ উভয়কেই এখন অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে। পুলিশ নিশ্চিত করেছে, দ্রুত ওই দুষ্কৃতীকে চিহ্নিত করে আইনের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments