Homeজেলাঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর: জন্মদিনে ফিরে দেখা বিধবা বিবাহ আন্দোলন, নারীশিক্ষা ও এক আপসহীন সমাজসংস্কারকের জীবন

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর: জন্মদিনে ফিরে দেখা বিধবা বিবাহ আন্দোলন, নারীশিক্ষা ও এক আপসহীন সমাজসংস্কারকের জীবন

Vidyasagar

নিউজ ডেস্ক: ক্যালেন্ডারের পাতায় ২৬ সেপ্টেম্বর দিনটি ফিরে এলেই নিয়ম করে স্কুল-কলেজ, সরকারি দপ্তর বা পাড়ার মোড়ে ধুলো জমা মূর্তিতে পড়ে তাজা ফুলের মালা। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে ওঠে তাঁর ছবি আর কিছু পরিচিত উদ্ধৃতি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মদিনটি আজ যেন কেবল একটি রুটিনমাফিক স্মরণসভার গণ্ডিতেই আটকে পড়েছে। কিন্তু যে মানুষটি উনিশ শতকের ঘোর কুসংস্কারাচ্ছন্ন বাংলায় দাঁড়িয়ে একা স্রোতের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন, যাঁর নাম শুনলে তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজপতিদের ভিত কেঁপে উঠত, তাঁকে কি সত্যিই আমরা বুঝতে পেরেছি? নাকি স্রেফ পরীক্ষার খাতায় উত্তরের কয়েকটা লাইনে এবং বছরে এক দিনের পুষ্পার্ঘ্যেই আমরা আবদ্ধ করে ফেলেছি বাংলার নবজাগরণের এই অন্যতম কাণ্ডারীকে? বিদ্যাসাগরের প্রয়াণের এক শতাব্দীরও বেশি সময় পার হওয়ার পর, আজও এই অমোঘ প্রশ্নটি সমাজের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

বাঙালির ইতিহাস ও মননে ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর এক যুগান্তকারী দিন। মেদিনীপুরের বীরসিংহ গ্রামের এক অতি দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নেওয়া ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের মেধা, অদম্য জেদ আর পাণ্ডিত্যের জোরে সমগ্র বাংলার কাছে হয়ে উঠেছিলেন ‘বিদ্যাসাগর’। তবে কেবল মাত্র অগাধ পাণ্ডিত্য বা বইয়ের পাতায় আটকে থাকা বিদ্যার জন্য তিনি ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে নেই। বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে বড় এবং অকৃত্রিম পরিচয়টি লুকিয়ে রয়েছে প্রচলিত এবং ঘুণে ধরা সামাজিক ব্যবস্থার চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন তোলার সাহসের মধ্যে। একটি সমাজের পরিবর্তন যে শুধু আইনের পাতায় ফতোয়া জারি করে হয় না, তার জন্য যে মানুষের মগজাস্ত্রে শান দিতে হয় এবং চিন্তাধারার খোলনলচে বদলাতে হয়— এই কঠিন সত্যটি তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন।

উনিশ শতকের বাংলায় নারীদের জীবন ছিল অন্ধকার আর অকথ্য যন্ত্রণার এক জীবন্ত নরক। বিশেষ করে স্বামীহারা বিধবা নারীদের জীবন ছিল চরম দুর্বিষহ। বাল্যবিবাহের অভিশাপে মাত্র আট-দশ বছর বয়সেই অনেককে বৈধব্যের সাদা থান পরতে হতো। সমাজ তাদের সমস্ত অধিকার কেড়ে নিয়ে কার্যত জীবন্মৃত করে রাখত। এই অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে প্রথম গর্জে ওঠেন বিদ্যাসাগর। তিনি প্রশ্ন তোলেন, একজন নারীর স্বামী মারা গেলে কেন তাঁর নিজের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারটুকুও সামাজিকভাবে শেষ হয়ে যাবে? এই যন্ত্রণাদায়ক প্রশ্নই তাঁকে টেনে নিয়ে যায় বিধবা বিবাহ আন্দোলনের একেবারে কেন্দ্রে। তবে বিদ্যাসাগর জানতেন, যুক্তির ধার ছাড়া কেবল আবেগ দিয়ে তৎকালীন রক্ষণশীল ও কূপমণ্ডূক সমাজকে টলানো যাবে না। তাই তিনি ধর্ম এবং শাস্ত্রের গণ্ডিতে ঢুকেই রক্ষণশীল পণ্ডিতদের পরাস্ত করার কৌশল নেন। দিনের পর দিন অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রাচীন শাস্ত্রীয় সূত্র পর্যালোচনা করে তিনি প্রমাণ করে দেন যে, বিধবা বিবাহ শাস্ত্রবিরুদ্ধ নয়। তাঁর নিরলস লড়াই, ক্ষুরধার লেখনী এবং প্রশাসনের কাছে লাগাতার দরবারের ফলস্বরূপ অবশেষে ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ ভারতের আইনসভায় পাশ হয় ‘হিন্দু উইডোজ রি-ম্যারেজ অ্যাক্ট’ (Hindu Widows’ Remarriage Act)। আইনি স্বীকৃতি পায় বিধবা বিবাহ।

কিন্তু আইন পাশ হওয়াটাই তাঁর কাছে শেষ কথা ছিল না। বিদ্যাসাগর জানতেন, আইনের কালিতে সমাজের মানসিকতা রাতারাতি বদলায় না। তাই সমাজসংস্কারকে তিনি কেবল বক্তৃতার মঞ্চে সীমাবদ্ধ না রেখে নিজের ব্যক্তিগত জীবনেও প্রয়োগ করেছিলেন চরম সাহসিকতার সঙ্গে। নিজের একমাত্র পুত্র নারায়ণের সঙ্গে এক বিধবা কন্যার বিবাহ দিয়ে তিনি তৎকালীন সমাজের গালে এক বিরাট চপেটাঘাত করেছিলেন। নিজের বিশ্বাসকে এমন চরম মূল্যে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করাটাই বিদ্যাসাগরকে অন্যান্য সাধারণ নেতাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়।

বিধবা বিবাহের পাশাপাশি নারীশিক্ষা ছিল বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কারের আরেক অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। আজ একুশ শতকে দাঁড়িয়ে মেয়েদের স্কুল-কলেজে যাওয়াটা আমাদের কাছে অতি স্বাভাবিক একটি বিষয়। কিন্তু সে যুগে পরিবারের অন্দরমহল থেকে মেয়েদের বের করে আনাটা ছিল এক অসাধ্য সাধন। সমাজের একাংশের ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে, নারীরা শিক্ষিত হলে সমাজ উচ্ছন্নে যাবে। এই অন্ধকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে গ্রামাঞ্চলে একের পর এক বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন বিদ্যাসাগর। ১৮৫৭ সালের শেষ দিক থেকে ১৮৫৮ সালের প্রথমার্ধের মধ্যে তাঁর নিজস্ব উদ্যোগে এবং পরিশ্রমে একাধিক বালিকা বিদ্যালয় গড়ে ওঠে। তাঁর কাছে শিক্ষা কেবল পুঁথিগত বিদ্যার বিষয় ছিল না, শিক্ষা ছিল মানুষের চিন্তার স্বাধীনতার একমাত্র পথ। সমাজের অর্ধেক অংশকে অন্ধকারে ডুবিয়ে রেখে যে কোনও জাতির সার্বিক উন্নতি যে নেহাতই এক মরীচিকা, তা তিনি গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন।

কেবল সমাজসংস্কারক হিসেবেই নয়, বাংলা ভাষা ও শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। তাঁর রচিত ‘বর্ণপরিচয়’ আজও প্রতিটি বাঙালির অক্ষরজ্ঞানের প্রথম সোপান। বাংলা ভাষাকে একটি সুসংগঠিত, বিজ্ঞানসম্মত এবং আধুনিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বাংলা গদ্যকে তিনি এমন এক সহজ, সুসংহত ও যুক্তিনির্ভর কাঠামো দিয়েছিলেন, যার ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্য বিশ্বের দরবারে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি তাঁর চরিত্রের এক অনন্য দিক ছিল সাধারণ মানুষের প্রতি অকৃত্রিম সহমর্মিতা। দরিদ্র, অসহায় ও বিপন্ন মানুষের পাশে তিনি যেভাবে নিঃস্বার্থভাবে দাঁড়াতেন, তা তাঁকে আপামর বাঙালির কাছে ‘দয়ার সাগর’ রূপে পরিচিত করেছিল। তাঁর কাছে সমাজসংস্কারের চূড়ান্ত লক্ষ্য কোনও তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করা ছিল না, বরং সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও একটু মর্যাদাপূর্ণ করে তোলাই ছিল তাঁর জীবনের মূল ব্রত।

লড়াইয়ের এই দীর্ঘ পথে তাঁকে প্রতিনিয়ত কদর্য আক্রমণ, প্রাণনাশের হুমকি এবং প্রবল বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কিন্তু জনপ্রিয়তার সস্তা হিসেব কষে তিনি কখনও নিজের আদর্শ থেকে একচুলও সরে আসেননি। ১৮৯১ সালে তিনি এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর আজ এতগুলো বছর কেটে গেলেও, সমাজ কি সত্যিই পুরোপুরি বদলেছে? আজও কি নারীশিক্ষা, নারীর অধিকার, সামাজিক বৈষম্য, কুসংস্কার এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্নগুলি প্রাসঙ্গিক নয়? আজও যখন পণপ্রথার বলি হতে হয় মেয়েদের, ডাইনি অপবাদে পুড়িয়ে মারা হয় নারীদের, কিংবা কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে মানুষ বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে, তখন মনে হয় বিদ্যাসাগর আজও বড় একা।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বিদ্যাসাগরকে স্মরণ করার সবচেয়ে বড় অর্থ হওয়া উচিত নিজেদের বিবেকের সামনে প্রশ্ন তোলা। যে মানুষটি আজীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই চালিয়েছিলেন, তাঁর জন্মদিনে কেবল তাঁর মূর্তিতে মালা পরানোটা আক্ষরিক অর্থেই এক প্রহসন। বিদ্যাসাগর আসলে কোনও ব্যক্তি নন, বিদ্যাসাগর হলো একটি চিন্তার নাম— যুক্তির পক্ষে এবং অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অদম্য সাহসের নাম। যতদিন না আমরা সেই প্রশ্ন করার সাহসটুকু নিজেদের মধ্যে জাগিয়ে তুলতে পারছি, ততদিন বিদ্যাসাগর কেবলই এক ক্যালেন্ডারের পাতায় বন্দি স্মৃতি হয়েই রয়ে যাবেন।

No Comments

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved