
নিউজ ডেস্ক; নদীর এ পাড় ভাঙে, ও পাড় গড়ে’—প্রবাদটি যেন বাস্তব হয়ে উঠেছে হাওড়ার শ্যামপুর এবং উলুবেড়িয়া দক্ষিণ বিধানসভা এলাকার হুগলি নদী সংলগ্ন অঞ্চলে। নদীর এক দিকে ক্রমশ চর জেগে উঠছে, অন্য দিকে বাড়ছে পাড় ভাঙনের তীব্রতা। দক্ষিণ ২৪ পরগনার দিকের নদীখাতে পলি জমে ভূমি উঁচু হওয়ার বিপরীতে হাওড়ার পশ্চিম তীরে জলের স্রোত ও ঢেউয়ের ধাক্কায় ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে নদীর পাড়। সেচ দফতরের উদ্যোগে বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ দেওয়ার কাজ হলেও ভাঙন পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
গত সোমবার গড়চুমুকের বাসুদেবপুর গ্রামের কাছে হুগলি নদীর পাড়ে বড়সড় ধস নামার ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ধসের প্রভাবে নদীর পাশের রাস্তাতেও বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। নদীর পাড়ের খুব কাছেই রয়েছে একটি পার্ক। স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভাঙন এ ভাবে চলতে থাকলে ওই পার্কের অংশও নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। তাঁদের বক্তব্য, এই এলাকায় এর আগেও একাধিক বার নদীর পাড়ে ধস নেমেছে। কিন্তু স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ফের একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
হাওড়ার গ্রামীণ এলাকার নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে এখন ভাঙনের চিহ্ন স্পষ্ট। বাউড়িয়ার দীপুপাড়া এবং থানাঘাট থেকে শুরু করে চেঙ্গাইল, উলুবেড়িয়া কালীবাড়ি, জেটিঘাট সংলগ্ন এলাকা, জগদীশপুর, কালীনগর, বেলাড়ি এবং পূর্ব বাসুদেবপুর—বিভিন্ন জায়গায় নদীর পাড় ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রের খবর। শ্যামপুরের গাদিয়াড়াতেও নদীভাঙনের আশঙ্কা ক্রমশ বাড়ছে।
অন্য দিকে নদীর বিপরীত পাড়ের ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বজবজ, বুড়ুল এবং ফলতা-সহ বেশ কিছু এলাকায় হুগলি নদীর বুকে পলি জমে চর তৈরি হচ্ছে। কোথাও কোথাও নদীর গতিপথ ও জলধারণের চরিত্রও বদলাচ্ছে। ফলে একই নদীর দুই পাড়ে একেবারে বিপরীত পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে নদী বিশেষজ্ঞ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।
সেচ দফতরের ইঞ্জিনিয়ারদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এর পিছনে অন্যতম কারণ নদীর স্বাভাবিক গতিপথের পরিবর্তন। নদী তার গতিপথ কিছুটা বদলে দক্ষিণ ২৪ পরগনার দিকে পলি ফেলছে। সময়ের সঙ্গে সেই পলি জমে ওই অংশ তুলনামূলক ভাবে উঁচু হয়ে উঠছে। ফলে জোয়ারের সময়ে জলের প্রবাহ পশ্চিম পাড় ঘেঁষে বইছে। স্রোতের চাপ সরাসরি হাওড়ার তীরের উপর পড়ায় সেখানে মাটির ক্ষয় বাড়ছে।
শুধু নদীর স্রোত নয়, জাহাজ চলাচলের প্রভাবও ভাঙন বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে সেচ দফতরের আধিকারিকদের একাংশের মত। হুগলি নদী দিয়ে বড় জাহাজ ও অন্যান্য জলযান চলাচলের সময়ে তৈরি হওয়া ঢেউ নদীর পাড়ে আছড়ে পড়ে। বার বার এই ধরনের ঢেউয়ের ধাক্কায় নদীতীরের মাটি আলগা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে আগে থেকেই দুর্বল পাড় দ্রুত ক্ষয়ে যেতে পারে।
তবে প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানবিক হস্তক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শ্যামপুর ও উলুবেড়িয়া এলাকার হুগলি নদীর তীরে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে বহু ইটভাটা। অভিযোগ, ইট তৈরির কাজে প্রয়োজনীয় পলি সংগ্রহ করতে কয়েকটি ভাটার মালিক নদীর বুক থেকে নিয়ম মেনে পলি তোলেন না। এর ফলে নদীর তলদেশের স্বাভাবিক গঠন এবং জলের গতিপথে পরিবর্তন ঘটছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের একাংশের।
যদিও এই অভিযোগ মানতে নারাজ শ্যামপুর থানা ব্রিকফিল্ড ওনার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনের সম্পাদক তন্ময় শীর দাবি, নদীর তীরে থাকা ইটভাটাগুলিতে মূলত জোয়ারের সময় নদীর জল পুকুর বা নির্দিষ্ট জলাশয়ে ঢুকিয়ে প্রাকৃতিক ভাবে পলি জমিয়ে তা সংগ্রহ করা হয়। তাঁর বক্তব্য, এই পদ্ধতিতে পলি সংগ্রহের জন্য সরকারি নিয়ম অনুযায়ী রাজ্য সরকারকে রাজস্বও প্রদান করেন ইটভাটা মালিকেরা। ফলে ইচ্ছামতো নদীর বুক কেটে পলি তুলে নেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয় বলেই তাঁর দাবি।
নদীভাঙনের ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়। সেচ দফতরের নথি অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালে উলুবেড়িয়া জেটিঘাট এবং উলুবেড়িয়া থানার মধ্যবর্তী এলাকায় হুগলি নদীর তীরে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছিল। সেই সময় ভাঙন আটকাতে লোহার শিট দিয়ে নদীর পাড় বাঁধার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নদীর স্বভাব বদলায়নি।
বরং গত কয়েক বছরে বাউড়িয়া, উলুবেড়িয়ার জগদীশপুর এবং বেলাড়ি-সহ বিভিন্ন এলাকায় বার বার ভাঙন দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে একাধিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে সেচ দফতর। কোথাও নদীর পাড়ে সিমেন্টের কংক্রিট ব্লক বা সিসি ব্লক ফেলে পাড়কে শক্ত করার চেষ্টা হয়েছে। আবার কোথাও শালবল্লা পুঁতে তার সঙ্গে বোল্ডার দিয়ে নদীতীর রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, সাময়িক ভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হচ্ছে না।
গড়চুমুকের বাসুদেবপুরে সাম্প্রতিক ধস সেই প্রশ্নই আবার সামনে এনেছে। নদীর পাড়ে ধসের পাশাপাশি রাস্তার গায়ে ফাটল দেখা দেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদের যাতায়াতই নয়, ওই এলাকার পর্যটনকেন্দ্রিক পরিকাঠামোও সমস্যায় পড়তে পারে। পার্কটির ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে আশঙ্কা।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। শ্যামপুরের বিজেপি বিধায়ক হিরণ্ময় ‘হিরণ’ চট্টোপাধ্যায়ের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন রোধে যে ধরনের পরিকল্পিত এবং স্থায়ী কাজ প্রয়োজন ছিল, তা ঠিকমতো হয়নি। আগের সরকারের সময়ে নদীতীর রক্ষার কাজে গাফিলতির কারণেই পরিস্থিতি এতটা জটিল হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
তবে নদীভাঙনের মতো জটিল প্রাকৃতিক সমস্যাকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক দোষারোপের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলেই মত স্থানীয়দের একাংশের। তাঁদের বক্তব্য, নদীর গতিপথ, পলি জমার চরিত্র, জোয়ার-ভাটার প্রবাহ, জাহাজ চলাচল এবং নদীর পাড়ের ব্যবহার—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, হুগলি নদীর পশ্চিম তীরে ভাঙনের প্রবণতা যদি এ ভাবেই বাড়তে থাকে, তা হলে আগামী দিনে শ্যামপুর ও উলুবেড়িয়ার নদী সংলগ্ন আরও বিস্তীর্ণ এলাকা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। নদীর কাছাকাছি থাকা রাস্তা, বসতি, পার্ক, কৃষিজমি এবং অন্যান্য পরিকাঠামোর উপর তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তাই শুধু ভাঙন শুরু হওয়ার পরে বোল্ডার বা কংক্রিট ব্লক ফেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বদলে নদীর দীর্ঘমেয়াদি গতিপথ এবং পলি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনার দাবি উঠছে। একই সঙ্গে নদীর বুক থেকে পলি সংগ্রহ, ইটভাটার কার্যকলাপ এবং জাহাজ চলাচলের কারণে তৈরি ঢেউ—এসব বিষয়ও নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এক দিকে নতুন চর তৈরি হচ্ছে, অন্য দিকে হারিয়ে যাচ্ছে নদীর পাড়। হুগলি নদীর দুই তীরের এই বৈপরীত্যই এখন হাওড়ার শ্যামপুর-উলুবেড়িয়া এলাকার মানুষের কাছে বড় উদ্বেগের কারণ। সোমবারের ধস সেই আশঙ্কাকে আরও এক বার সামনে এনে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন, নদীর স্বাভাবিক গতিকে সম্মান জানিয়ে কী ভাবে নদীতীরবর্তী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়—তার স্থায়ী উত্তরই খুঁজতে হবে প্রশাসনকে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments