Homeপশ্চিম বর্ধমানআসানসোলআসানসোল-দুর্গাপুরে মন্দির ঘিরে নতুন পর্যটন সার্কিট, তৈরি হচ্ছে ডিপিআর

আসানসোল-দুর্গাপুরে মন্দির ঘিরে নতুন পর্যটন সার্কিট, তৈরি হচ্ছে ডিপিআর

resizeplus_Screenshot 2026-08-30 172224_edited (1)

নিউজ ডেস্ক; শিল্পাঞ্চল বললেই এত দিন চোখের সামনে ভেসে উঠেছে কারখানার চিমনি, কয়লার খনি আর ব্যস্ত জনজীবন। সেই পরিচিত ছবির পাশাপাশি এ বার পশ্চিম বর্ধমানকে পর্যটনের মানচিত্রে আরও জোরালো ভাবে তুলে ধরার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। আসানসোল ও দুর্গাপুরের একাধিক ঐতিহাসিক এবং আধ্যাত্মিক স্থানকে এক সূত্রে গেঁথে সার্কিট ট্যুরিজম গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে জেলা প্রশাসন। ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পের ডিটেলড প্রজেক্ট রিপোর্ট বা ডিপিআর তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর। রাজ্য পর্যটন দপ্তরের অনুমোদন মিললেই পরবর্তী কাজ শুরু করা হবে।

প্রস্তাবিত এই পর্যটন সার্কিটে থাকছে আসানসোলের রামকৃষ্ণ মিশন, কল্যাণেশ্বরী মন্দির এবং ঘাঘরবুড়ি মন্দির। এর সঙ্গে দুর্গাপুরের রাঢ়েশ্বর শিবমন্দির এবং গড়জঙ্গলের ঐতিহাসিক শ্যামরূপা মন্দিরকেও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ একই সফরে পর্যটকরা শিল্পাঞ্চলের দুই শহরের ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান ঘুরে দেখার সুযোগ পাবেন।

পশ্চিম বর্ধমানের জেলাশাসক এস পোন্নমবলম জানিয়েছেন, প্রকল্পটির লক্ষ্য শুধু কয়েকটি দর্শনীয় স্থানকে তালিকাভুক্ত করা নয়। পর্যটকদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো উন্নয়ন, স্থানগুলির মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং একটি পরিকল্পিত পর্যটন রুট তৈরির দিকেও নজর দেওয়া হবে।

জেলাশাসকের কথায়, আসানসোলের রামকৃষ্ণ মিশন, কল্যাণেশ্বরী ও ঘাঘরবুড়ি এবং দুর্গাপুরের রাঢ়েশ্বর শিবমন্দির ও গড়জঙ্গলের শ্যামরূপা মন্দিরকে নিয়ে সার্কিট ট্যুরিজমের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পরিকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটকরা যাতে একই সফরে এই জায়গাগুলি ঘুরে নিতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও করা হবে। প্রকল্পের ডিপিআর প্রায় তৈরি হয়ে গিয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

এই উদ্যোগের অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে ঘাঘরবুড়ি মন্দির। আসানসোলের এই প্রাচীন মন্দিরের প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে স্থানীয় ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরেই নানা তথ্য প্রচলিত। প্রায় চার শতাব্দী ধরে এই মন্দিরকে ঘিরে ধর্মীয় আবেগ রয়েছে। সারা বছর ভক্তদের আনাগোনা থাকলেও বিভিন্ন পুজো এবং বিশেষ তিথিতে এখানে ভিড় উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়ে যায়। মন্দিরকে ঘিরে স্থানীয় মেলাও বসে।

অন্য দিকে, কল্যাণেশ্বরী মন্দিরও এই অঞ্চলের অন্যতম পরিচিত ধর্মীয় স্থান। প্রায় পাঁচশো বছরের পুরনো বলে স্থানীয় ভাবে পরিচিত এই মন্দিরে বছরভর বহু মানুষের যাতায়াত রয়েছে। বিশেষ পুজো এবং উৎসবের সময়ে ভক্তসমাগম আরও বেড়ে যায়। দুই প্রাচীন মন্দিরের সঙ্গে আসানসোল রামকৃষ্ণ মিশনকে যুক্ত করা হলে ধর্মীয় পর্যটনের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক পর্যটনের ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে প্রশাসন।

দুর্গাপুরের ক্ষেত্রেও রয়েছে সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের সম্ভার। মুচিপাড়া সংলগ্ন রাঢ়েশ্বর শিবমন্দির দীর্ঘদিন ধরে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্র। সারা বছরই এখানে মানুষের যাতায়াত থাকে। পুজোর সময় মন্দির চত্বরে মেলা বসে। ফলে ধর্মীয় পর্যটনের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও এই মন্দিরের যোগ রয়েছে।

আর গড়জঙ্গলের শ্যামরূপা মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একাধিক ঐতিহাসিক ও লোকবিশ্বাস। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, রাজা সুরথ এবং বৈশ্য সমাধির সঙ্গে এই অঞ্চলে দুর্গাপুজোর প্রাচীন ইতিহাস জড়িত। অষ্টমীর সকালে এখানে বিপুল সংখ্যক ভক্তের সমাগম হয়। জঙ্গলঘেরা পরিবেশ এবং প্রাচীন মন্দিরের আবহ পর্যটকদের কাছেও আলাদা আকর্ষণ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

প্রশাসনের এই পরিকল্পনার পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের একটি দাবি। আসানসোল ও দুর্গাপুরের ঐতিহাসিক মন্দির এবং আধ্যাত্মিক স্থানগুলিকে নিয়ে একটি পর্যটন সার্কিট তৈরির প্রস্তাব বহু দিন ধরেই ছিল। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বিষয়টি বিধানসভায় তুলেছিলেন বলে জানা গিয়েছে। সেই প্রস্তাবের পর রাজ্য পর্যটন দপ্তরের তরফে জেলা প্রশাসনের কাছে পরিকল্পনা চাওয়া হয়। তার ভিত্তিতেই বর্তমানে ডিপিআর তৈরির কাজ এগিয়েছে।

তবে একই সঙ্গে দুর্গাপুরের পর্যটন সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করার জন্য দুর্গাপুর ব্যারাজে ওয়াটার স্পোর্টস এবং ইকো-ট্যুরিজম চালুর প্রস্তাবও উঠেছিল। কিন্তু এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে। দামোদর নদ এবং দুর্গাপুর ব্যারাজের সঙ্গে ডিভিসি ও রাজ্য সেচ দপ্তরের ভূমিকা জড়িত। ফলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলির অনুমোদন পেতে সময় লাগতে পারে। সেই কারণে আপাতত জলকেন্দ্রিক পর্যটনের ওই দুই প্রস্তাব স্থগিত রাখা হয়েছে।

প্রশাসনের বর্তমান পরিকল্পনা তাই তুলনামূলক ভাবে সহজে বাস্তবায়নযোগ্য ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্রগুলিকে নিয়েই। একটি নির্দিষ্ট রুট তৈরি হলে পর্যটকরা নিজের মতো করে বিচ্ছিন্ন ভাবে জায়গাগুলি ঘোরার পরিবর্তে পরিকল্পিত ভাবে একাধিক স্থান পরিদর্শন করতে পারবেন। এর ফলে এক দিনের সফরকে কেন্দ্র করে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্তদের একাংশও এই উদ্যোগকে ইতিবাচক ভাবে দেখছেন। তাঁদের বক্তব্য, বাইরে থেকে পর্যটক বাড়লে শুধু মন্দির বা দর্শনীয় স্থানগুলির আয় বাড়বে না, উপকৃত হবে স্থানীয় অর্থনীতির একাধিক ক্ষেত্র। হোটেল, রেস্তোরাঁ, ট্রাভেল এজেন্সি, গাড়ি ভাড়া, চালক, স্থানীয় দোকানদার—সবাই এর সুফল পেতে পারেন।

দুর্গাপুর পুরসভার গেস্ট হাউস মাঙ্গলিকের পরিচালন সংস্থার কর্ণধার সুপ্রিয় গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে, এই পাঁচটি জায়গাকে কেন্দ্র করে পর্যটন সার্কিট তৈরি হলে বাইরে থেকে আরও বেশি পর্যটক আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর মতে, এর ফলে হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসার পাশাপাশি ভ্রমণ সংস্থা, গাড়ির মালিক এবং চালকদের জন্যও নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে প্রকল্প সফল করতে হলে শুধু রাস্তা বা যাতায়াতের ব্যবস্থা করলেই হবে না। পর্যটনকেন্দ্রগুলির পরিচ্ছন্নতা, পানীয় জল, শৌচাগার, বসার জায়গা, নিরাপত্তা, পার্কিং এবং পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যের ব্যবস্থাও করতে হবে। একই সঙ্গে প্রাচীন মন্দির ও ঐতিহাসিক স্থাপত্যের সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ঐতিহ্যের চরিত্র অক্ষুণ্ণ রাখাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

সব মিলিয়ে শিল্পাঞ্চলের পরিচিতির বাইরে পশ্চিম বর্ধমানের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে সামনে আনার নতুন দরজা খুলতে পারে এই সার্কিট ট্যুরিজম প্রকল্প। রাজ্য পর্যটন দপ্তরের অনুমোদন পাওয়ার পর বাস্তব কাজ কত দ্রুত শুরু হয় এবং কী ধরনের পরিকাঠামো তৈরি করা হয়, এখন সেদিকেই নজর পর্যটন মহলের। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আসানসোল-দুর্গাপুরের পর্যটন মানচিত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

No Comments

    একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

    LINKS

    ABOUT US

    ফোন নম্বর

    +৯১ ৮৪২০৬৫৮৯৯৯

    আমাদের ঠিকানা

    আর্চ স্কোয়ার X2 বিল্ডিং
    কলেজ মোড়, সেক্টর ৫
    কলকাতা - ৭০০০৯১

    Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved