
নিউজ ডেস্ক; প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীও আইনের ঊর্ধ্বে নন—এই বার্তা দিয়ে বিধানসভার গ্রন্থাগার থেকে বই নিয়ে ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ তুললেন রাজ্যের গ্রন্থাগারমন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ। তাঁর দাবি, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে বিধানসভা গ্রন্থাগার থেকে একাধিক বই ইস্যু করা হয়েছিল। তার মধ্যে রবীন্দ্র রচনাবলীর বিভিন্ন খণ্ড এবং ‘সঞ্চয়িতা’ও ছিল। নথি অনুযায়ী, রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর সেই বইগুলি আর গ্রন্থাগারে ফেরত আসেনি বলে দাবি করেছেন তিনি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও আশ্বাস দিয়েছেন মন্ত্রী।
বীরভূমের সিউড়িতে বিবেকানন্দ গ্রন্থাগারের ১২৭তম প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন গৌরীশঙ্কর ঘোষ। বুধবার সেখানে বক্তব্য রাখার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বিধানসভা গ্রন্থাগারের বই ফেরত না আসার প্রসঙ্গটি সামনে আনেন। একই অনুষ্ঠানে রাজ্যের গ্রন্থাগারগুলিতে কী ধরনের বই রাখা হবে, সেই নিয়েও সরকারের ভাবনার কথা জানান তিনি।
বিধানসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, গ্রন্থাগার থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে মোট ১৯টি বই ইস্যু করা হয়েছিল। ওই তালিকায় রবীন্দ্র রচনাবলীর ১৮টি খণ্ড এবং ‘সঞ্চয়িতা’ রয়েছে বলে দাবি। গ্রন্থাগারের নথি অনুযায়ী, বইগুলি ইস্যু হওয়ার পর দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও সেগুলি আর ফেরত দেওয়া হয়নি। এমনকি এই বিষয়ে গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষের তরফে মমতার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টাও করা হয়েছে বলে সূত্রের খবর।
তবে বিষয়টি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও সামনে এসেছে। সূত্রের দাবি, ওই বইগুলি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত বাড়িতে নেই। বইগুলি তাঁর মুখ্যমন্ত্রীর দফতরেই রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে বইগুলি ঠিক কোথায় রয়েছে, তা নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে জটিলতা তৈরি হয়েছে। গ্রন্থাগারের আধিকারিকেরা বইগুলির অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানা গিয়েছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ করা হবে, সেই প্রশ্ন উঠেছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে গ্রন্থাগারমন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ বলেন, আইনের ক্ষেত্রে কারও জন্য আলাদা নিয়ম হতে পারে না। তাঁর বক্তব্য, কোনও ব্যক্তি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বা বিশিষ্টজন হলেও বই ফেরত দেওয়ার নিয়ম তাঁর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সাধারণ কোনও পাঠক বই নিয়ে ফেরত না দিলে যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়, একই নিয়মে এই ক্ষেত্রেও পদক্ষেপ করা হবে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, “আইন সবার জন্য সমান।” তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পদমর্যাদা বা পরিচয়ের কারণে কেউ নিয়মের বাইরে থাকতে পারেন না। ফলে বিধানসভা গ্রন্থাগারের বই ফেরত না দেওয়ার অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ করা হবে বলেই ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, রাজ্যের গ্রন্থাগারগুলিতে বইয়ের সংগ্রহ নিয়েও বড়সড় পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছেন গৌরীশঙ্কর। তাঁর দাবি, গ্রন্থাগারগুলিতে আর অপ্রাসঙ্গিক বই রাখা হবে না। এর বদলে রাষ্ট্রবাদ, জাতীয়তাবাদ এবং যুব সমাজের মেধার বিকাশে সহায়ক বইকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এই প্রসঙ্গে তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বইকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যের সমস্ত গ্রন্থাগারে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের লেখা অথবা তাঁকে নিয়ে লেখা বই রাখা হবে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ভূমিকা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, তিনি না থাকলে বাংলা থাকত না।
তবে মন্ত্রীর বক্তব্যের পাল্টা প্রতিক্রিয়া এসেছে তৃণমূলের তরফে। কালীঘাট-তৃণমূলের আইনজীবী বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, এই ধরনের অভিযোগ আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজনৈতিক ভাবে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা।
বৈশ্বানরের বক্তব্য, যিনি দীর্ঘদিন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন এবং যাঁর লেখা বই সাধারণ মানুষ পড়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধেই গ্রন্থাগার থেকে বই নিয়ে ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তাঁর দাবি, মমতার লেখা বই একসময় রাজ্যের বিভিন্ন গ্রন্থাগারে রাখা হত। সেই প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের মন্ত্রীর এমন অভিযোগকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে করছে তৃণমূল।
ফলে বই ফেরত না দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। একদিকে গ্রন্থাগারমন্ত্রীর দাবি, বিধানসভার নথিতে বইগুলি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে ইস্যু করা হয়েছিল এবং দীর্ঘদিনেও সেগুলি ফেরত আসেনি। অন্যদিকে তৃণমূলের তরফে অভিযোগ করা হচ্ছে, এই বিষয়টিকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা হচ্ছে।
এই বিতর্কের পাশাপাশি রাজ্যের গ্রন্থাগারগুলির বই নির্বাচনের নীতি নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কোন ধরনের বই গ্রন্থাগারে থাকবে এবং কোন বইকে অপ্রাসঙ্গিক বলে বাদ দেওয়া হবে, তা নিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্য ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রবাদী ও জাতীয়তাবাদী বইয়ের উপর জোর দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ঘিরে ভবিষ্যতে আরও বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
এখন নজর থাকবে বিধানসভা গ্রন্থাগারের নথি অনুযায়ী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে ইস্যু হওয়া বইগুলি শেষ পর্যন্ত কোথায় পাওয়া যায় এবং সেগুলি গ্রন্থাগারে ফেরত আসে কি না। একই সঙ্গে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সত্যিই কোনও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ গ্রন্থাগারমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, আইনের প্রয়োগে পদমর্যাদার কোনও বিশেষ সুবিধা থাকবে না।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments