Homeনদিয়াকালীগঞ্জস্মার্টফোনে লুডো খেলা ঘিরে তুমুল বচসা ও মারধর! ছেলেকে উন্মত্ত জনতার হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে পিটুনিতে মর্মান্তিক মৃত্যু বাবার

স্মার্টফোনে লুডো খেলা ঘিরে তুমুল বচসা ও মারধর! ছেলেকে উন্মত্ত জনতার হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে পিটুনিতে মর্মান্তিক মৃত্যু বাবার

নিউজ ডেস্ক: বর্তমান যুগে স্মার্টফোন এবং তাতে থাকা বিভিন্ন অনলাইন বা অফলাইন গেম তরুণ প্রজন্মের কাছে এক মারাত্মক নেশায় পরিণত
baba

নিউজ ডেস্ক: বর্তমান যুগে স্মার্টফোন এবং তাতে থাকা বিভিন্ন অনলাইন বা অফলাইন গেম তরুণ প্রজন্মের কাছে এক মারাত্মক নেশায় পরিণত হয়েছে। আর সেই সামান্য একটি মোবাইল গেম যে কতটা ভয়ংকর রূপ নিতে পারে এবং কীভাবে এক নিমেষে একটি জলজ্যান্ত প্রাণ কেড়ে নিয়ে একটি গোটা পরিবারকে ধ্বংস করে দিতে পারে, এবার তার এক জ্বলন্ত ও শিউরে ওঠার মতো উদাহরণ দেখল রাজ্যবাসী। নিছকই একটি মোবাইলে লুডো খেলাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সামান্য বচসা থেকে একেবারে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ! আর সেই সংঘর্ষে আক্রান্ত ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে বেধড়ক মারধরের শিকার হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হলো খোদ জন্মদাতা পিতার। অবিশ্বাস্য এবং চরম চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে নদিয়া জেলার কালীগঞ্জ থানা এলাকার অন্তর্গত দেবগ্রামে। তুচ্ছ একটি কারণে এমন একটি মর্মান্তিক খুনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই গোটা দেবগ্রাম এলাকা জুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য এবং তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। শোকের ছায়া নেমে এসেছে নিহতের পরিবার ও পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে।

স্থানীয় সূত্রে এবং পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নদিয়ার কালীগঞ্জ থানার দেবগ্রাম রেললাইনের ধারের একটি পাড়ায় দীর্ঘদিন ধরে সপরিবারে বসবাস করতেন প্রৌঢ় আবদুল দফাদার। তাঁর ছেলের নাম রাহুল দফাদার। জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার এলাকারই বেশ কয়েকজন পরিচিত প্রতিবেশী যুবকের সঙ্গে বাড়ির কাছাকাছি একটি জায়গায় বসে নিজের মোবাইলে লুডো খেলছিল ছেলে রাহুল। লুডো এমনিতে অত্যন্ত নিরীহ এবং সময় কাটানোর একটি জনপ্রিয় ইনডোর গেম হলেও, ডিজিটাল মাধ্যমে খেলার সময় কোনো একটি নির্দিষ্ট দান বা চাল দেওয়াকে কেন্দ্র করে রাহুলের সঙ্গে ওই প্রতিবেশী যুবকদের হঠাৎ করেই তীব্র মতানৈক্য শুরু হয়।

খেলার সেই সাধারণ তর্কাতর্কি মুহূর্তের মধ্যেই অত্যন্ত কদর্য রূপ ধারণ করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় থেকে শুরু করে একে অপরকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে শুরু করে ওই যুবকেরা। এরপর পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, অভিযুক্ত যুবকরা আচমকাই সংঘবদ্ধ হয়ে রাহুলের ওপর চড়াও হয় এবং তাকে বেধড়ক মারধর করতে শুরু করে। ছেলের আর্তনাদ এবং বাড়ির কাছে তুমুল চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে আর স্থির থাকতে পারেননি বাবা আবদুল দফাদার। ছেলেকে একদল যুবকের হাতে ওইভাবে নির্দয়ভাবে মার খেতে দেখে জন্মদাতা পিতা হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই তিনি ছুটে যান ঘটনাস্থলে। ছেলেকে আক্রমণকারীদের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং পরিস্থিতি শান্ত করতে তিনি দু’পক্ষের মাঝে ঢাল হয়ে দাঁড়ান।

কিন্তু উন্মত্ত ওই যুবকদের চোখে তখন যেন আক্রোশের নেশা। বয়োজ্যেষ্ঠ একজন মানুষ তাদের থামাতে এসেছেন, সেই ন্যূনতম সম্মানবোধটুকুও তারা হারিয়ে ফেলেছিল। অভিযোগ, রাহুলকে ছেড়ে দিয়ে এরপর ওই যুবকরা আবদুল দফাদারের ওপরই ঝাঁপিয়ে পড়ে। বয়স্ক মানুষটির ওপর শুরু হয় এলোপাথাড়ি কিল, চড়, ঘুষি ও লাথি। আচমকা এই প্রবল শারীরিক আক্রমণ এবং বেধড়ক পিটুনির জেরে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আবদুল সাহেব। তাঁর আর্তনাদে ছুটে আসেন অন্যান্য প্রতিবেশীরা। অবস্থা বেগতিক দেখে সেখান থেকে তড়িঘড়ি চম্পট দেয় অভিযুক্তরা। স্থানীয় বাসিন্দা এবং পরিবারের সদস্যরা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ও গুরুতর আহত অবস্থায় আবদুল দফাদারকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাঁকে পরীক্ষা করে মৃত বলে ঘোষণা করেন। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত মারধরের ফলে হওয়া অভ্যন্তরীণ আঘাত বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কারণেই হয়তো তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তবে ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট এলেই মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।

সামান্য লুডো খেলা নিয়ে পাড়ার ভেতরে এমন একটি মর্মান্তিক খুনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই গোটা দেবগ্রাম এলাকায় রীতিমতো বারুদের মতো উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষোভে ফুঁসতে থাকেন স্থানীয় বাসিন্দারা। খবর পেয়ে আর বিন্দুমাত্র কালবিলম্ব না করে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে কালীগঞ্জ থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী। পরিস্থিতি যাতে আর হাতের বাইরে না যায় এবং নতুন করে কোনো আইনশৃঙ্খলা জনিত সমস্যা বা অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, তার জন্য এলাকায় পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

পুলিশের এক পদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন, “একটি মোবাইল গেম খেলাকে কেন্দ্র করে প্রথমে বচসা ও পরে হাতাহাতি হয়। ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে বাবার মৃত্যুর একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আমরা পেয়েছি। মৃতদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। আমরা ইতিমধ্যেই একটি স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছি।” ঘটনার সঙ্গে কারা কারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল, তা খতিয়ে দেখতে স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। অভিযুক্তরা সকলেই গা ঢাকা দেওয়ায় তাদের খোঁজে এলাকায় ব্যাপক তল্লাশি অভিযান শুরু হয়েছে। খুব দ্রুতই দোষীদের গ্রেপ্তার করে তাদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা-সহ অন্যান্য কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে পুলিশ প্রশাসনের তরফে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

এই মর্মান্তিক ঘটনাটি সমাজের একটি অত্যন্ত অন্ধকার দিককে আমাদের সামনে আবার নতুন করে উন্মোচিত করে দিল। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের মধ্যে সহনশীলতা বা টলারেন্স ক্রমশ তলানিতে এসে ঠেকছে। ভার্চুয়াল জগতের সামান্য জয়-পরাজয়কে তারা বাস্তব জীবনের ইগোর লড়াই বা সম্মান রক্ষার প্রশ্ন হিসেবে ধরে নিচ্ছে। আর সেই ইগোর সংঘাতেই হারিয়ে যাচ্ছে মানবিকতা, মূল্যবোধ এবং বয়স্কদের প্রতি শ্রদ্ধা। একটি ভার্চুয়াল লুডো গেমের চাল কীভাবে একজন জলজ্যান্ত মানুষের জীবনের শেষ চাল হয়ে উঠতে পারে, দেবগ্রামের এই ঘটনা যেন সেই ভয়ংকর বাস্তবটিকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। আপাতত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সরব হয়েছেন নিহত আবদুল দফাদারের পরিবার ও প্রতিবেশীরা।

No Comments

তাজা খবর

আরও পড়ুন

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved